জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর ‘লুটতরাজ’ ও অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য!
• বরিশাল জেলাতেই খুঁটি গেড়ে বসে আছেন প্রায় দেড় যুগ
• রয়েছে ঘুষবাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও টেন্ডার জালিয়াতির অভিযোগ
• ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে গড়েছেন দুর্নীতির দুর্ভেদ্য দুর্গ
• ঊর্ধ্বতনরা একই স্থানে তিনটি সরকারের আমল অবস্থানের নজির নেই
• ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে
হাসান মাহমুদ রিপন:
মেঘনা-কীর্তনখোলা বিধৌত এই পলল ভূমিতে জনপদের তৃষ্ণা মেটানোর পবিত্র দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত, সেই বিভাগীয় প্রকৌশল কার্যালয়টিই এখন মূর্তিমান এক ‘দুর্নীতির কারখানায়’ রূপান্তরিত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE), বরিশাল জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস.এম. সহিদুল ইসলাম যেন এক অঘোষিত সম্রাট। যিনি গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। স্থানীয় গণমাধ্যম, ভুক্তভোগী ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যমতে, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষবাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও টেন্ডার জালিয়াতির পাহাড়সম অভিযোগ এখন জনমুখে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বদলি নীতিমালার সমাধি:
সরকারি চাকরির সাধারণ ব্যাকরণ অনুযায়ী, তিন বছর অন্তর কর্মস্থল পরিবর্তনের নিয়ম থাকলেও শহিদুল ইসলামের ক্ষেত্রে তা যেন সম্পূর্ণ অকার্যকর। রহস্যজনক কারণে তিনি প্রায় দেড় যুগ ধরে বরিশাল অঞ্চলেই খুঁটি গেড়ে বসে আছেন। মাঝে একবার লোকদেখানো বদলি হয়ে ফরিদপুর সার্কেলে গেলেও, মাত্র এক মাসের মধ্যেই অদৃশ্য জাদুবলে পুনরায় বরিশালের সিংহাসনে ফিরে আসেন। দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে কোনো উর্ধ্বতন কর্মকর্তার এমন একনাগাড়ে এক স্থানে অবস্থানের নজির বিরল, যা মূলত বদলি নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। স্থানীয় ঠিকাদার ও তার সহকর্মীদের দাবি, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে কোনো কর্মকর্তার একাধারে এত দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে থাকার তেমন কোনোদৃষ্টান্ত নেই। আওয়ামী লীগ, অর্ন্তবর্তীকালীন এবং বর্তমান-— এই তিন সরকারের আমলেই তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। যা তার লবিং এবং ক্ষমতার গভীর শেকড়কেই নির্দেশ করে।
স্থবিরতাহীন এক রাজত্ব:
জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বারবার একই এলাকায় নিজের অবস্থান সুসংহত রেখেছেন। এমনকি একবার ফরিদপুর সার্কেলে বদলি করা হলেও প্রশাসনিক অদৃশ্য শক্তির জাদুমন্ত্রে মাত্র এক মাসের মাথায় তিনি পুনরায় বরিশালের তখতে ফিরে আসেন। গুঞ্জন রয়েছে আইনী বৈধতা পাওয়ার জন্য তিনি ইচ্ছেকৃতভাবে বদলীর নামে ফরিদপুর সার্কেলে গিয়েছিলেন। ঐ এক মাস বাদ দিলে তিনি প্রায় দেড় যুগ বরিশালে কর্মরত আছেন। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ইতিহাসে কোনো টেকনিক্যাল দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একই স্থানে এতো দীর্ঘ সময় অবস্থান করার নজির নেই বললেই চলে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী নেতা এবং দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সখ্য ও ‘ম্যানেজ’ করার অসামান্য দক্ষতাই তাকে এই রাজকীয় স্থায়িত্ব দান করেছে।
স্বজনপ্রীতি ও টেন্ডার মোড়লগিরি:
প্রকৌশলী সহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো—তিনি রাষ্ট্রীয় দপ্তরটিকে পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের ঠিকাদারদের অভিযোগ, তিনি বড় বড় প্রকল্পের কাজগুলো কৌশলে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও পছন্দের পেটুয়া ঠিকাদারদের পাইয়ে দেন। এক্ষেত্রে তিনি ‘অদৃশ্য ম্যান্ডেট’ জারি করেন। মেসার্স সিকদার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেনসহ একাধিক ঠিকাদার ক্ষোভের সাথে জানান, দরপত্র আহ্বানের পর থেকেই শুরু হয় প্রকৌশলীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ। যোগ্য ঠিকাদারদের অফিসে ডেকে সরাসরি শাসানো হয় যাতে তারা টেন্ডারে অংশগ্রহণ না করেন।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, বরিশাল কার্যালয়ে নিজের খাস কামরার যাবতীয় সাজসজ্জা বা ‘ইন্টেরিয়র ডিজাইন’ কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই প্রায় ৫-৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তিনি নিজেই সম্পন্ন করেছেন। যা পিপিআর (PPR) আইনের চরম অবমাননা। মূলত তার অধীনে বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের বড় বড় প্রকল্পের কাজগুলো একটি নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায় না। এতে সাধারণ এবং যোগ্য ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সরকারের বিশাল অংকের বাজেট লুটপাট হচ্ছে উন্নয়নের নামে।
সম্পদ যখন আকাশচুম্বী: নামে-বেনামে শতকোটি:
বাকেরগঞ্জের দুধল ইউনিয়নের সুন্দরকাঠী গ্রামের পৈতৃক ভিটায় যার যাতায়াত নেই বললেই চলে, সেই প্রকৌশলীর সম্পদের বিস্তার এখন মহানগরী ছাড়িয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকায়। তথ্য বলছে, বরিশালের সিএন্ডবি রোডে ইয়ামাহা শোরুম সংলগ্ন মূল্যবান জমি এবং অক্সফোর্ড মিশন রোডে পাঁচতলা বিশিষ্ট আলিশান ভবন ক্রয় করেছেন তিনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিএন্ডবি রোডের ভবনটির মালিকানা হিসেবে সাইনবোর্ডে নাম রয়েছে তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা, মনিরুজ্জামান মোল্লা এবং নিকটাত্মীয় সাইফুন্নাহার কাকলী ও ডা. সাম্মি আক্তার। মূলত এটি প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বেনামি সম্পদের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। স্থানীয়দের দাবি, এর নেপথ্য অর্থদাতা প্রকৌশলী শহিদুল নিজেই।
এছাড়া ঢাকার গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় তার এবং তার স্ত্রীর নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে বিভিন্ন অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্ত্রী লিপি ইসলামের ব্যাংক ও পোস্ট অফিস অ্যাকাউন্টে বিপুল অংকের ফিক্সড ডিপোজিট এবং সঞ্চয়পত্রের তথ্য পাওয়া গেছে। তাছাড়া নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবে সঞ্চয়পত্র ও ফিক্সড ডিপোজিট আকারে কয়েক শত কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
আওয়ামী প্রভাব ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া:
অভিযোগ রয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে শহিদুল ইসলামের ছিল ঘনিষ্ঠ সখ্যতা। বিশেষ করে সাবেক এক নির্বাচন কমিশনারের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে তিনি প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এখনো তার এই ক্ষমতার নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি বলে স্থানীয়দের ধারণা। এমনকি অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর ‘ব্যাচমেট’ ও ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হওয়ার সুবাদে তিনি রক্ষাকবচ পাচ্ছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বচ্ছতার অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার বহাল থাকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
আওয়ামী বলয় থেকে বর্তমান ঘনিষ্ঠতা:
প্রকৌশলী এস.এম সহিদুল ইসলামের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশীর্বাদ। অভিযোগ আছে, সাবেক নির্বাচন কমিশনার (আওয়ামী লীগ পন্থি) আলমগীর হোসেনের নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাদে তিনি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দানবীয় ক্ষমতা ভোগ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়গুলোতে সংক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা বারংবার লিখিত অভিযোগ দিলেও সদর দপ্তর বা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রতিকার মেলেনি। অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় অভিযোগপত্রগুলো গায়েব হয়ে যেত অথবা ধামাচাপা দেওয়া হতো। তৎকালীন প্রভাবশালী নেতাদের তুষ্ট করে এবং প্রধান প্রকৌশলীদের মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি বরিশালে দুর্নীতির রামরাজত্ব কায়েম রেখেছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পটপরিবর্তন হলেও তার দাপট কমেনি। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর ব্যাচমেট ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার দোহাই দিয়ে তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিগত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হতে শুরু করলে স্থানীয়রা মুখ খুলতে শুরু করেন। অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ পেশ করছেন।
ঘুষের হাট ও কমিশন বাণিজ্য:
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তরে দুর্নীতির শিকড় কত গভীরে, তার প্রমাণ মেলে লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও। বরিশাল সার্কেলের প্রতিটি কাজ মানেই যেন নির্দিষ্ট অংকের কমিশন। লাইসেন্স নবায়ন থেকে শুরু করে নতুন প্রকল্পের বিল পাস—সবখানেই ঘুষের রমরমা কারবার। অভিযোগ রয়েছে, তার দপ্তরে দায়িত্বরত কতিপয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে ‘স্যারের’ নাম করে অর্থ আদায় করেন। একটি সাধারণ বহি নবায়নেও পাঁচশত থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দিতে হয়। যারা এই নিয়ম মানতে অস্বীকার করেন, তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে ফাইল আটকে রাখা কিংবা নানা অজুহাতে হয়রানি করা। ঠিকাদারদের দাবি, বিগত সরকারের সাবেক নির্বাচন কমিশনার আলমগীর হোসেনের সাথে আত্মীয়তার সুবাদে তিনি প্রশাসনিক সকল নিয়মকে তুচ্ছজ্ঞান করে এই লুটের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে তার রূঢ় আচরণ এবং তুচ্ছ কারণে মানসিক নির্যাতন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রান্তিক এলাকায় শাস্তিমূলক বদলি করে নিজের অনুগত ও ‘কমিশন সংগ্রাহক’ কর্মকর্তাদের তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে রেখেছেন। এমনকি সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ থাকলেও তিনি সেখানে না থেকে জনস্বাস্থ্য ভবনের ভিআইপি গেস্ট রুম দখল করে ব্যক্তিগত আবাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন দীর্ঘকাল।
দুদকের জালে দুর্নীতির খতিয়ান:
ইতোমধ্যেই শহিদুল ইসলামের এই অস্বাভাবিক সম্পদ ও দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকশত কোটি টাকার এই অবৈধ সম্পদের উৎস মূলত উন্নয়ন প্রকল্পের মোটা অঙ্কের কমিশন এবং টেন্ডার জালিয়াতি। ঠিকাদারদের দাবি, প্রতিটি কাজের কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নির্দিষ্ট হারে ‘অনৈতিক সুবিধা’ বা ঘুষ প্রদান করতে হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও জমা পড়েছে অভিযোগের স্তূপ। বরগুনার কামাল এন্টারপ্রাইজ ও পটুয়াখালীর চুন্নু মিঞার মতো ঠিকাদারেরা জানান, অতীতে বহুবার অভিযোগ দিলেও মন্ত্রণালয়ের একটি অসাধু চক্র টাকার বিনিময়ে ফাইলগুলো গায়েব করে দিচ্ছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি করছেন।
অসদাচরণ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা:
শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, প্রকৌশল সহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অধস্তন কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। তার একক সিদ্ধান্তে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয় এবং দুর্নীতিতে সহায়তা করার জন্য তার অনুগতদের বিশেষ সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন করা হয়। এমন পক্ষপাতমূলক ও অনিয়মতান্ত্রিক আচরণের কারনে বরিশাল জোনের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্যাতিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তার এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ফলে দপ্তরের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
এসব বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়ালের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযুক্তের বয়ান:
সার্বিক বিষয়ে প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে কর্তৃপক্ষ রাখলে আমার কি বলার থাকতে পারে। আমি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায়ই এখানে আছি। ঘুষ, দুর্নীতি আর টেন্ডারবাজীর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগজুড়ে কার্যালয়গুলোকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছেন কিনা এমন অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার চাকরীর প্রায় শেষ পর্যায়ে, আমিও চাই এখান থেকে এখন সড়ে যেতে।’
ঠিকাদারদের দাবি ও তদন্তের আহ্বান:
বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন যেন একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির মাধ্যমে শহিদুল ইসলামের গত প্রায় দেড় যুগের কর্মকাণ্ড ও উপার্জিত সম্পদের হিসাব গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতে, সঠিক তদন্ত হলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই বিশাল লুটপাটের চিত্র উন্মোচিত হবে এবং দেশের সম্পদ রক্ষায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ঠিকাদাররা ঐক্যবদ্ধভাবে এই লুণ্ঠন ও একাধিপত্যের অবসান চেয়েছেন। বরিশালবাসীর জিজ্ঞাসা—কী এমন যাদু আছে এই প্রকৌশলীর হাতে, যার কারণে তিন তিনটি সরকারের আমল পার হয়ে গেলেও তার ক্ষমতার চেয়ারটি টলে না?
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ ব্যাপারে বলেন, চাকরি বিধি অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে টানা তিন বছরের বেশি থাকতে পারেন না। তাছাড়া নিজ জেলায়ও বদলী হয়ে যেতে পারেন না। আর যদি কেউ দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকেন তাহলে তিনি সেখানে তার অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। গড়ে তুলেন অনিয়ম দুর্নীতির সিন্ডিকেট।
জনমত:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করার কথা থাকলেও বরিশালে এটি যেন এক ব্যক্তির পকেট ভারী করার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই ‘লুটের সাম্রাজ্য’ যদি উপড়ে ফেলা না হয়, তবে সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মুখ থুবড়ে পড়বে। একজন প্রকৌশলীর শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এবং দেড় দশক একই স্থানে স্থলাভিষিক্ত থাকা কেবল অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রের সুশাসনের মুখে চপেটাঘাত। সাধারণ মানুষের বিশুদ্ধ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই ‘দুর্নীতির মহীরুহকে’ অপসারণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে সহিদুল ইসলামের মতো ‘ফ্যাসিবাদী প্রেতাত্মারা’ কীভাবে এখনো বহাল তবিয়তে থাকেন, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত ও দুদকের কঠোর পদক্ষেপই পারে এই ‘হরিলুটের কারখানা’ বন্ধ করে বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য দপ্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। অন্যথায়, দুর্নীতির এই বিষবৃক্ষ পুরো দপ্তরের জনসেবা কার্যক্রমকেই চিরতরে পঙ্গু করে দেবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই শ্বেতহস্তীর উৎস সন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
জনসাধারণের নিরাপদ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার যে পবিত্র দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত, তা যদি দুর্নীতির রাহুগ্রাসে নিমজ্জিত থাকে, তবে রাষ্ট্রের মৌলিক লক্ষ্যই ব্যাহত হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে বরিশাল সার্কেলের প্রকৌশলী সহিদুল ইসলামের মতো ‘হরিলুটের কারিগরদের’ এই ‘ইম্পেরিয়াল’ দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি। অন্যথায়, তৃণমূল পর্যায়ে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পরিবর্তে কেবল কয়েকজনের পকেট ভারী করার মাধ্যমেই পর্যবসিত হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুদক এই নজিরবিহীন দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলবে কি না—এখন সেটাই দেখার বিষয়।
জনসাধারণের নিরাপদ পানির সংস্থান নিশ্চিত করার যে পবিত্র দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত, তা যদি দুর্নীতির রাহুগ্রাসে নিমজ্জিত থাকে, তবে রাষ্ট্রের মৌলিক লক্ষ্যই ব্যাহত হবে। তাই বরিশাল সার্কেলের এই ‘ইম্পেরিয়াল’ দুর্নীতির অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
