দুর্নীতির মহীরুহ ডিপিডিসির অন্দরমহলে
• ‘ভয়ানক অসুন্দর’ সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক গিরগিটির উত্থান
• মাত্র আঠারো বছরের কর্মজীবনে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়
• সাদা অবয়বের আড়ালে গিলে খাচ্ছেন জাতীয় সম্পদ
• হীন স্বার্থ চরিতার্থে গোপনীয় নথি দিত বিদেশীদের হাতে
হাসান মাহমুদ রিপন:
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) লিমিটেড—¬ রাষ্ট্রীয় এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দুর্নীতির পচন ধরেছে। বাইরে থেকে চাকচিক্যময় মনে হলেও এর অন্দরমহলে জেঁকে বসেছে অনিয়মের এক বিশাল সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে যার নাম ঘুরেফিরে আসছে, তিনি হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাজিবুল হাদী। বাহ্যিক অবয়বে তিনি প্রজাতন্ত্রের একজন নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করলেও, অন্দরমহলের বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র আঠারো বছরের কর্মজীবনে তিনি যে পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এবং ‘ভয়ানক অসুন্দর’ মায়াজাল তিনি বিস্তার করেছেন আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, তা হার মানায় যেকোনো রূপকথার কালো অধ্যায়কেও। সাদা অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ক্ষুধার্ত শিকারির মতো তিনি গিলে খাচ্ছেন জাতীয় সম্পদ। তার বিরুদ্ধে ওঠা সুউচ্চ অভিযোগের পাহাড় এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। আর তার সন্দেহজনক আন্তর্জাতিক লেনদেনের বিষয়টি গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
যেন রাজনৈতিক গিরগিটির গল্প:
রাজিবুল হাদীর কর্মজীবনের সূচনালগ্ন থেকেই খোলস পরিবর্তনের এক অদ্ভুত কারিশমা পরিলক্ষিত হয়। ২০০৭ সালে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ডিজাইন পরিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী পদে তার যাত্রা শুরু। তবে ২০০৮ সালের ৯ জুলাই ডিস্ট্রিবিউশন প্লানিং (দক্ষিণ শাখা) বিভাগে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে ডিপিডিসিতে প্রবেশই ছিল তার ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি। হাদীর পেশাদারিত্বের চেয়ে বড় গুণ ছিল তার ‘রাজনৈতিক গিরগিটি’র মতো আচরণ। যখন যে দল ক্ষমতায়, তখন সেই দলের প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা ছিল তার সহজাত প্রবৃত্তি।
অভিযোগ রয়েছে, যশোরের নাজির সংকরপুর গ্রাম থেকে উঠে আসা এই কর্মকর্তার চরিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায় এক চরম সুবিধাবাদী সত্তা। রাজনৈতিক পটের পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি ভোল পাল্টাতে পারদর্শী। ভিন্ন ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অতীত থাকলেও, গত দেড় দশকে নিজেকে তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নিকটাত্মীয় হিসেবে জাহির করেন। অভিযোগ রয়েছে, পলাতক ফ্যাসিস্ট শাসনামলে যশোরের এক সাবেক সংসদ সদস্যের ভাগ্নে পরিচয় ব্যবহার করে ডিপিডিসিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ত্রাস কায়েম করেছিলেন। সহকর্মী থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিম্মি করে রাখার মতো দুঃসাহস দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেন। তুচ্ছ কারণে গালিগালাজ এবং অপমানজনক আচরণ ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ডিপিডিসির প্রকৌশলী মহলে তাকে নিয়ে এক প্রকার চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
রাষ্ট্রের অর্থ যখন লুটের মাল:
বর্তমানে হাদী ‘ডিপিডিসি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক জিটুজি প্রকল্পের অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে আসীন। অভিযোগের তীরটি এখানেই সবচেয়ে ধারালো। তিনি নিজ হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে প্রকল্পের সকল গোপনীয় নথি অর্থের বিনিময়ে চীনা ও দেশীয় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে জানা যায়। দেশের সার্বভৌম স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তিনি চীনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘তেবিয়ান ইলেকট্রিক অ্যাপারেটাস কোম্পানি লিমিটেড’ (টিবিইএ)-এর এজেন্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
ডিপিডিসি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রকৌশলী হাদীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী পারভেজ এ কাজের জন্য একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই চক্রে শাও ও লি নামক দুই চীনা নাগরিকের সরব উপস্থিতি ছিল। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন পাপ্পু নামের জনৈক ঠিকাদার। তারা যোগসাজশ করে ৫-৬টি ভুয়া কোম্পানি খুলে দরপত্রে অংশগ্রহণ করেন, যা আদতে স্রেফ আইওয়াশ বা লোকদেখানো প্রতিযোগিতা ছিল। এই প্রক্রিয়ায় ‘সিনম’ নামক এক চীনা সংস্থাকে ২০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি ৫ শতাংশ হারে নগদ ডলার ও ইউরোতে কমিশন গ্রহণ করেছেন বলে অকাট্য তথ্য প্রমান রয়েছে বলে অভিযোগে প্রকাশ।
নকশা জালিয়াতি ও শতকোটি টাকার ক্ষতি:
একজন প্রকৌশলী হিসেবে হাদীর মূল কারসাজি চলত প্রকল্পের কারিগরি ড্রয়িং ও ডিজাইনে। অভিযোগ আছে, চীনা কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিতে তিনি নকশায় ব্যাপক ‘নয়-ছয়’ করতেন। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। ডিপিডিসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান ও প্রাক্তন জিটুজি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাহাবুব রহমান তাকে একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করলেও তিনি তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ার দাপটে তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার এই স্বেচ্ছাচারিতায় রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা স্রেফ অপচয় হয়নি, বরং লুটপাট হয়েছে।
সম্পদের পাহাড় ও হুন্ডি বাণিজ্য:
একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বৈধ আয়ের সঙ্গে প্রকৌশলী রাজিবুল হাদীর যাপিত জীবনের ব্যয় ও অর্জিত সম্পদের কোনো সংগতি নেই। অনুসন্ধান বলছে, ‘এমা কনস্ট্রাকশন’ এবং ‘বেসিক’ নামক দুটি বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মূলত তারই নিয়ন্ত্রণে। তার ও স্ত্রীর নামে নিজ জেলা যশোরের নাজির সংকরপুরে রয়েছে অঢেল স্থাবর সম্পত্তি। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক প্লট, যমুনা ফিউচার পার্কে বাণিজ্যিক দোকান এবং রূপায়নে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে তার।
তবে কেবল দেশেই সীমাবদ্ধ নয় তার এই অবৈধ সাম্রাজ্য। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো তার অর্থ পাচার। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের বড় একটি অংশ মতিঝিলের সুনির্দিষ্ট হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে আমেরিকা ও দুবাইতে পাচার করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তার এই সন্দেহজনক আন্তর্জাতিক লেনদেনের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
গ্রাহক হয়রানি ও স্বেচ্ছাচারিতা:
২০১৮-১৯ সালে খিলগাঁও ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন হাদী যে পরিমাণ জুলুম চালিয়েছেন, তা এখনো স্থানীয় গ্রাহকদের মনে দগদগে ক্ষত হিসেবে আছে। নতুন সংযোগের জন্য লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া ছিল তার অলিখিত নিয়ম। এমনকি তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে আসা গ্রাহকদের কাছ থেকেও তিনি নির্দ্বিধায় টাকা দাবি করতেন। সাধারণ মানুষের হয়রানি ও চোখের পানিই ছিল তার আয়ের উৎস। অনিয়মের কারণে একসময় তাকে ওএসডি করে টঙ্গী স্টোরে বদলী করা হলেও, অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি বারবার ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বাগিয়ে নিয়েছেন।
এসব ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল হাদীর মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ও প্রশাসনিক অবস্থান:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে হাদীর দম্ভ এতোটাই প্রকট ছিল যে, তিনি অধীনস্থদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিতেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জনৈক নেতার (পলাাতক) নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি ডিপিডিসি দপ্তরে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখতেন। তবে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে।
ডিপিডিসির মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজিবুল হাদীর মতো বর্ণচোরা কর্মকর্তাদের অবস্থান পুরো বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক ভয়াবহ ক্যানসার। সাধারণ মানুষ যখন চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে হিমশিম খাচ্ছে, তখন একজন কর্মকর্তার এমন আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই ফুটিয়ে তোলে। যদিও বর্তমান বিদ্যুৎ সচিব এবং ডিপিডিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো—হাদী এখনো বহাল তবিয়তে। দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) ও বিএফআইইউ-এর তদন্ত যদি দ্রুত আলোর মুখ না দেখে, তবে এই বিষবৃক্ষ পুরো সংস্থাকে গ্রাস করে ফেলবে।
বিদ্যুৎ সচিব ফারহানা মমতাজ এ ব্যাপারে বলেন, অভিযোগ উঠলে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সেগুলো তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অসঙ্গতি ও দুর্নীতি অনেকটাই দৃশ্যমান। যার ফলে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আর তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
ডিপিডিসির মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবা সংস্থায় রাজিবুল হাদীর মতো ‘বর্ণচোরা’ কর্মকর্তাদের বিচরণ শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। কিভাবে তিনি ডিপিডিসিতে এখনো স্বপদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এই দুর্নীতির ক্যানসার বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংস করার আগেই কঠোর অস্ত্রোপচার এখন সময়ের দাবি। জাতির লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। জাতির প্রত্যাশা, নতুন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই দুর্নীতির বরপুত্রদের মুখোশ উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে। অন্যথায়, মেধাবী ও সৎ প্রকৌশলীদের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং জনগণের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও বিলীন হয়ে যাবে।
