সওজ প্রকৌশলী সবুজ খানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক
শেখ ফয়সাল আহমেদ :
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে! ওবায়দুল কাদেরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এর অন্যতম সদস্য ছিলেন সড়ক পরিবহন এবং মহাসড়ক বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান।
যার নেতৃত্বে চলতো সড়কে সীমাহীন অনিয়ম লুটপাট দুর্নীতি। কারণ তার মাথার উপরে হাত ছিল স্বয়ং তৎকালীন সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের। এইজন্য সবুজ উদ্দিন খানের সড়কে ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের আগে ওবায়দুল কাদেরের ভ্যানগার্ড হিসেবে অত্যন্ত একরোখা ও দাপুটে কর্মকর্তা হিসেবেই পরিচিতি ছিল তার। অবশ্য সরকার বদলের পর সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে জয়দেবপুর-বেদগ্রাম-ভূলতা-মদনপুর বাইপাস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছিল।
২০০৯ সালের পর নিজের ইচ্ছেমতো সড়ক বিভাগের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা এই তিন কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । ৮ বছর দায়িত্বে ছিলেন অধিদপ্তরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে। তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অলিখিত মালিক হিসেবেই পরিচিতি ছিল তার। কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ নিয়েছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের নামে।
ঠিকাদারী ব্যবসা, বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ লুটপাট দুর্নীতি বদলী বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন সড়ক থেকে শত শত কোটি টাকা এবং এই অবৈধ অর্থে ক্রয় করেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ।
সম্পদের তালিকায় রয়েছে :
উত্তরায় ১১ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়ি। কাগজপত্রের মালিকানা দেখিয়েছেন স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্না, শ্যালিকা নুরজাহান আক্তার ও নার্গিস আক্তার হীরার নামে।
বর্তমানে বসবাস করেন পরিবার নিয়ে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের ৫২ নম্বর বাসায়, এই ফ্ল্যাটটির মূল্য আনুমানিক কয়েক কোটি টাকা।
রাজধানীর গুলশানে রয়েছে একাধিক লাক্সারিয়াস ফ্লাট।
এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রয়েছে একাধিক প্লট ফ্লাট।
নিজ জন্মস্থান পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার
ঢালারচর ইউনিয়নের মীরপুর চরে আছে ১০০ বিঘা জমি।
স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্নার নামে জাতসাখিনী ইউনিয়নের নান্দিয়ারা গ্রামে রয়েছে ৩০ বিঘা জমি।
গাজনার বিলে মাহমুদার নামে আরো আনুমানিক ৫০ বিঘা জমি।
আমিনপুর থানার মাসুন্দিয়া ইউনিয়নের সবুজের গ্রামের ডুপ্লেক্স বাড়ি ২০ বিঘা জমির ওপর যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। তবে রয়েছে একটি নিজস্ব বাহিনী ফলে এই বাড়ির আশেপাশে কেউ যেতে পারে না।
একই গ্রামে সিনথি পাঠশালা নামে ৫০ বিঘা জমির ওপর মাঠসহ স্কুল ও গরুর ফার্ম করেছেন স্ত্রী।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী শ্যামপুর, চর শ্যামপুর, দয়ালনগর, আমিরাবাদ, মালঞ্চি, বাদাই, শাতালী, তালিমনগর, চিনাখড়া ও কাশিনাথপুর-নান্দিয়ারা গ্রামে নামে-বেনামে আরো ২০০ বিঘা জমি ক্রয় করেছে।
স্ত্রী ও দুই সন্তানের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা গাড়ি।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে দেশের বাহিরে পাচার করেছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। অথচ সবুজ খানের পিতা মরহুম সিরাজ উদ্দিন খানের তেমন কোন অর্থ সম্পদ ছিল না এত সম্পদ ক্রয় করেছে অবৈধ অর্থে।
২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে উঠে আসে গত ১৬ বছরে সড়কের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে এই দুর্নীতির ফলে দেশের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সড়কের সেই দুর্নীতিবাদ শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অধিকাংশ সদস্যরা আজও সক্রিয় এবং ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রকাশ্য আছে বহাল তবিয়তে নিজ দপ্তরে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে সবুজ খানের বিরুদ্ধে একের পর এক বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার দুর্নীতির ভয়ঙ্কর গল্প নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয় কিন্তু তিনি কোন কিছুই তোয়াক্কা করতেন না এবং অদৃশ্য কারণে থেমেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। সম্প্রতি প্রকৌশলী সবুজ খানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক স্ত্রী মাহমুদা আক্তার, দুই ছেলে মারুফ হাসান খান, সাফায়েত খান সিফাত ও পরিবারের আরো অন্যান্য সদস্যদের নামে বেনামে অর্থ ও সম্পদ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি প্রেরণ করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী বলেন বিগত সরকারের আমলে বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন তিনি কিন্তু তার কোন শাস্তি হবে না কারণ তিনি অবৈধ অর্থ দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করে আবার ফিরে আসবেন আগের রূপে।
বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী বলেন তিনি কখনো সাংবাদিকদের ফোন রিসিভ করেন না এবং সামনে গেলে খুব বাজে আচরণ করেন কারণ তার ভিতরে এখনও রয়েছে সেই পুরাতন ক্ষমতার প্রভাব।
প্রকৌশলী সবুজ খানের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এমনকি খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
