রুধিরস্নাত শাপলা চত্বর: বিচারের কাঠগড়ায় ডিপিডিসি
• শিগগিরই জারি হতে যাচ্ছে গ্রেফতারি পরোয়ানা
• কয়েক দিনের মধ্যেই অপরাধীদের হাতে পড়বে হাতকড়া
• সুপরিকল্পিত মরণফাঁদ পেতেছিল স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী
• মানবতার আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের নব দিগন্ত
হাসান মাহমুদ রিপন :
সেদিন গোধূলি বেলার আকাশ যখন রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল, কেউ ভাবেনি রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হবে বুলেটের গর্জনে। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী এক সুপরিকল্পিত মরণফাঁদ পেতেছিল। নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, অপারেশন ‘ফ্ল্যাশ আউট’ সফল করতে প্রধান অন্তরায় ছিল আলো। ফলে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যবহার করে সুকৌশলে সম্পন্ন করা হয় ‘ইলেক্ট্রিক ব্ল্যাক আউট’। মতিঝিল ও আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদকে মুহূর্তেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত করা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না; বরং এটি ছিল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে করা এক পৈশাচিক ষড়যন্ত্র। যখন রাজপথের সোডিয়াম বাতিগুলো নিভে গেল, তখনই শুরু হলো বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। অন্ধকারে দিকভ্রান্ত মানুষগুলো যখন জীবন বাঁচাতে ছোটাছুটি করছিল, তখন ঘাতকদের মারণাস্ত্র শান্তিকামী আলেম-ওলামাদের বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল।
২০১৩ সালের ৫ মে। ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ একটি তারিখ মনে হলেও, বাংলার ইতিহাসের ললাটে এটি এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। সেদিন মতিঝিলের শাপলা চত্বরের নীল আকাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়েছিল, আর রাতের আঁধার ঘনীভূত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এক নারকীয় 'ইলেকট্রিক ব্ল্যাক আউট' বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাধ্যমে। দীর্ঘ এক যুগ পর, সেই বিভীষিকাময় রজনীর বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে এবার ন্যায়বিচারের অমোঘ ঘণ্টা বাজতে চলেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) খুব শীঘ্রই ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী (ডিপিডিসি) লিমিটেডের প্রভাবশালী প্রকৌশলীসহ অন্তত ত্রিশজন রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে শিগগিরই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে যাচ্ছে।
অন্ধকারের আড়ালে যে ষড়যন্ত্র:
স্মৃতির মণিকোঠায় ধুলো জমলেও সেই রাতের আর্তনাদ আজও বাতাসে অনুরণিত হয়। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হঠাৎ করেই নেমে এসেছিল যমদূতের ছায়া। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীল নকশায় অপারেশন ‘ফ্ল্যাশ আউট’ পরিচালনার ঠিক আগ মুহূর্তে মতিঝিল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে কৃত্রিম অন্ধকার সৃষ্টি করা হয়। এই পরিকল্পিত ব্ল্যাক আউটের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাতের নিস্তব্ধতায় আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন আর লাশের স্তূপকে জনচক্ষুর অন্তরালে রাখা।
অন্ধকারের প্রকৌশল ও সুকৌশলী হত্যাকাণ্ড:
সেদিন রাতের অপারেশন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল এক সুনিপুণ ও নির্মম পাণ্ডুলিপির বাস্তবায়ন। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। যখন হাজার হাজার হেফাজত কর্মী মহানগরের হৃদপিণ্ডে অবস্থান নিয়েছিলেন, তখন তাদের ঘিরে থাকা বাতিগুলো হঠাৎ নিভে যায়। একে পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘ইলেকট্রিক ব্ল্যাক আউট’। কিন্তু তদন্তকারীরা বলছেন, এটি ছিল মূলত অপরাধীদের সুরক্ষাকবচ।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) তৎকালীন মতিঝিল সার্কেলের নীতি-নির্ধারকরা কার নির্দেশে এই আঁধার নামিয়েছিলেন, তার দালিলিক প্রমাণ এখন তদন্তকারীদের হাতে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল ডিপিডিসিকে দেওয়া এক চিঠিতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চেয়েছিল। যার উত্তর পাওয়ার পর উন্মোচিত হয়েছে চাঞ্চল্যকর সত্য। অথচ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ডিপিডিসি প্রেরিত উত্তরে সংস্থাটির দায়িত্বরত উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকেরই নাম পরিচয় জানানো হয়নি। তবে ফোরম্যান ও লাইনম্যানদের নাম দিয়েছে নির্ভুলভাবে। যদিও ডিপিডিসির তৎকালীন নীতিনির্ধারক ও মাঠ পর্যায়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম এখন মামলার ডকে। তালিকায় রয়েছেন:
• ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) নজরুল হাসান: তৎকালীন এমডি, যার নিয়ন্ত্রণে ছিল পুরো ডিপিডিসি প্রশাসন।
• মো. মিজানুর রহমান: তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন), যিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পলাতক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
• মো. খালিকুজ্জামান: তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (সেন্ট্রাল), যিনি অপারেশনাল নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
• মো. মহিউদ্দিন: তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (মতিঝিল সার্কেল)।
• মো. হাবিবুর রহমান: তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (মতিঝিল), যিনি ইতোমধ্যে পরলোকগমন করেছেন।
• মো. শের আলী: তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (মতিঝিল), বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ডেমরা সার্কেল)।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই কর্মকর্তারা কেবল আদেশ পালনই করেননি, বরং এর বিনিময় হিসেবে পরবর্তীতে লোভনীয় পোস্টিং এবং দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে 'পুরস্কৃত' হয়েছিলেন। যা স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে সেই রাতে তাদের ভূমিকা ছিল স্রেফ ‘সরকারি দায়িত্ব’ পালনের ঊর্ধ্বে—এক চরম অপরাধে সহায়তা করা। সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্রুতই ওয়ারেন্ট জারি করে তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানা গেছে।
প্রকৌশলীদের দায়িত্ব ছিল জনসেবা নিশ্চিত করা, অথচ তাঁরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে বীভৎসতা চালিয়েছিল, তার দায়ভার বিদ্যুৎ বিভাগ এড়াতে পারে না।
বিচারের বাঁশিতে পরোয়ানা সুর:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, এই মামলার তদন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৭ জুনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রসিকিউশন টিম। সূত্র মতে, অভিযুক্তের তালিকায় কেবল প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ নন, বরং অন্তত ৩০ জনেরও বেশি সাবেক আমলা ও বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
তদন্ত সংস্থা সূত্রে খবর পাওয়া গেছে যে, খুব শীঘ্রই ডিপিডিসির সেই অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতে যাচ্ছে। যারা দেশে অবস্থান করছেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বিচার প্রক্রিয়ায় যে গতি সঞ্চার হয়েছে, তাতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখছে। সময়ের পরিক্রমায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতনের পর থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
তদন্তের তীক্ষ্ণ আলোয় অপরাধীরা:
২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ডিপিডিসিকে এক কড়া চিঠি প্রদান করে। সেখানে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর চাওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, “আমরা ডিপিডিসি থেকে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে পেয়েছি। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নেপথ্যে যারা কলকাঠি নেড়েছিলেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এটি স্রেফ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল একটি গণহত্যাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার কৌশলগত অংশ।”
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ওই রাতে কেবল ঢাকাতেই ৩২ জন মানুষ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বুলেটে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এছাড়া পরবর্তী কয়েক দিনে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে আরও ২৬ জনের শাহাদাত বরণের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। মোট ৫৮ জনের রক্তভেজা এই তালিকায় খুনিদের পরিচয় এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
একটি বিচারহীন সংস্কৃতির সমাপ্তি:
২০১৩ থেকে ২০২৪—দীর্ঘ এগারো বছর শাপলা চত্বরের ঘটনার কোনো বিচার তো দূরে থাক, একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করতে পারেনি নিহতের স্বজনরা। বরং উল্টো নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাদের। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ডিপিডিসিকে কড়া চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছিল—রাত কটা থেকে কটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল এবং কার আদেশে এই ব্ল্যাক আউট কার্যকর করা হয়েছিল। ডিপিডিসি সেই চিঠির উত্তরে যে তথ্য প্রদান করেছে, তা মূলত অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ফাঁসের দড়িতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ন্যায়বিচারের আশা:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পদার্পণ করে। পরবর্তী বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সময়কালে এই স্তিমিত হয়ে যাওয়া তদন্তে গতি সঞ্চার হয়। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে পুনরায় মামলা দায়ের করার পর ট্রাইব্যুনাল বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের নেতৃত্বাধীন সেই 'অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট' সফল করতে সিভিল প্রশাসনের বিশাল একটি অংশ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল।
কাঠগড়ায় উল্লেখযোগ্য যারা:
প্রসিকিউশন আগামী ৭ জুনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে প্রধান আসামি হিসেবে রাখা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ:
• শেখ হাসিনা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান নীতিনির্ধারক।
• মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান: নেপথ্য অভিযান সমন্বয়কারী।
• সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর: যার নির্দেশে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।
• বেনজীর আহমেদ: তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার, যাকে এই গণহত্যার মাঠপর্যায়ের স্থপতি বলা হয়।
• ইমরান এইচ সরকার: গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত।
• সাবেক আইজিপি শহীদুল হক ও হাসান মাহমুদ খন্দকার।
বিচার ও গণআকাঙ্ক্ষা:
কবি বলেছিলেন, "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।" দীর্ঘ এক দশক ধরে যারা সন্তানহারা মায়ের কান্না কিংবা স্বামীহারা স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাসকে পদদলিত করে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ছিলেন, তাদের জন্য এখন কারাগারের লৌহকপাট উন্মুক্ত। মতিঝিলের প্রতিটি ধূলিকণা আজও যেন সেই রাতের সাক্ষী দিচ্ছে। শাপলা চত্বরের সেই বধ্যভূমি এখন আর কেবল একটি জায়গার নাম নয়, এটি একটি প্রতিরোধের স্মারক।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্ল্যাক আউটের সময় নিরপরাধ ঘুমন্ত মানুষের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ না থাকায় সাংবাদিকরা সেই ভয়াবহ চিত্র ধারণ করতে পারেননি, যার সুযোগ নিয়েছিল ঘাতকচক্র। তবে আধুনিক ফরেনসিক তথ্য ও সাক্ষীগণের জবানবন্দিতে এখন সেই যবনিকা সরে গেছে।
সমাপ্তি ও আগামীর প্রত্যাশা:
বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শাপলা চত্বরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন হয়ে উঠেছে নির্যাতিতদের শেষ ভরসাস্থল। ডিপিডিসি’র অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সংবাদে দেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির সুবাতাস বইছে।
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, স্বৈরশাসক সাময়িকভাবে সত্যকে ধামাচাপা দিতে পারলেও চিরতরে মুছে ফেলতে পারে না। শাপলা চত্বরের সেই 'ব্ল্যাক আউট' ছিল মানবতার ইতিহাসের এক কৃষ্ণপক্ষ। আর আজকের আইনি প্রক্রিয়া সেই অন্ধকার ঘুচিয়ে ভোরের সূর্যোদয় ঘোষণা করছে। ৩০ জনের এই তালিকায় কেবল রাজনীতিবিদ নয়, বরং সেইসব আমলারাও রয়েছেন যারা পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে দলীয় দাসে পরিণত হয়েছিলেন।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো পুলিশি অভিযানের মধ্য দিয়ে অপরাধীদের হাতে হাতকড়া পড়বে। সেদিন হয়তো মতিঝিলের শাপলাগুলোর পাপড়ি আবারও স্নিগ্ধতায় ভরে উঠবে, আর বিদেহী আত্মাগুলো পাবে পরম শান্তি। শাপলা চত্বর গণহত্যার বিচার পাবে, বাংলাদেশ কলঙ্কযুক্ত হবে—এটাই এখন কোটি মানুষের প্রার্থনা।
এক নজরে মামলার তথ্যচিত্র:
• মোট নিহতের সংখ্যা: ৫৮ জন (তদন্তাধীন)।
• ব্ল্যাক আউটের কেন্দ্রবিন্দু: মতিঝিল শাপলা চত্ত্বর এলাকা।
• মূল অভিযুক্ত: শেখ হাসিনাসহ ৩০ জন।
• তদন্তের অগ্রগতি: ৯০ শতাংশ সম্পন্ন।
• গুরুত্বপূর্ণ তারিখ: ৭ জুন ২০২৫ (প্রতিবেদন দাখিলের শেষ সময়)।
বিচারের অপেক্ষায় শোকার্ত পরিবার:
দীর্ঘ বারো বছর ধরে নিহতদের পরিবারগুলো বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে গুমরে কেঁদেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশে যে নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে, তার হাত ধরেই এখন ন্যায়ের পথ সুগম হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, কেবল মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্য নয়, বরং যারা পর্দার আড়ালে থেকে ব্ল্যাক আউটের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং যারা সেই আদেশ তামিল করেছেন, তাদের প্রত্যেককে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
জনসাধারণের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ:
বাংলার সাধারণ মানুষ চায় শাপলা চত্বরের এই তদন্ত যেন কোনো প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়ে সত্যের দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যারা নিরীহ মানুষের ওপর অন্ধকারে গুলিবর্ষণ করেছে এবং যারা সেই অন্ধকার তৈরির কলকাঠি নেড়েছে, তাদের প্রত্যেককে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ হওয়াটা এই মামলার এক বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। কারণ, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, হত্যাকাণ্ডটি ছিল প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিকল্পিত একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাঁড়াশি অভিযানে নামতে পারে। অনেক সাবেক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তবে প্রসিকিউশন আশাবাদী, ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশের বাইরে থাকা আসামিদেরও ফিরিয়ে এনে কাঠগড়ায় তোলা সম্ভব হবে।
ইতিহাসের দায়মুক্তি:
শাপলা চত্বরের সেই রক্তভেজা মাটি আজও ন্যায়বিচারের জন্য হাহাকার করে। শাপলা চত্বরের সেই রাতের আর্তনাদ এক দশক ধরে বাংলার আকাশে-বাতাসে গুমরে কাঁদছিল। আজ সেই কান্নার ভাষা খুঁজে পেয়েছে আইনের শব্দমালা। বিদ্যুতের সুইচ টিপে যারা রাজপথকে বধ্যভূমিতে পরিণত করতে সহায়তা করেছিলেন, তাদের জন্য এখন কারাগারের লৌহকপাট অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই পদক্ষেপ কেবল একটি মামলার রায় নয়, বরং এটি হবে সত্যের জয়গান এবং খুনিদের জন্য চরম সতর্কবার্তা। স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক শুদ্ধি অভিযান। অন্ধকারের কারিগরদের বিচার নিশ্চিত হলেই কেবল কলঙ্কমুক্ত হবে বাংলার মাটি। সত্যের সূর্যোদয় আসন্ন, আর অপরাধীদের পলায়নের পথ রুদ্ধ হতে চলেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মনে করে, এই বিচারের মাধ্যমেই ইতিহাসের সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের দায়মুক্তি ঘটবে এবং আগামী দিনে সরকারি কর্মকর্তাদের 'আদেশ পালনের' নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা বন্ধ হবে।
রাজধানীর সেই পিচঢালা সড়কগুলো এখনো সাক্ষী দিচ্ছে সেই রাতের আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধের। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কখন সেই অপরাধীদের হাতকড়া পরে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
