আজিমপুর আবাসন প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
শেখ ফয়সাল আহমেদ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে একের পর এক বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়ম দুর্নীতির ভয়াবহ তথ্য। সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে বেশ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে নানা প্রতিবেদন।
পাবনা সুজানগর উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের কালীমন্দির গ্রামের আব্দুল হালিম ও ইসমত আরা হালিমের ছেলে ফয়সাল হালিম। ২০১৪ সালে ৩৪তম বিসিএস ক্যাডার সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। অভিযোগ আছে চাকরি জীবনের শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে এবং ঘনিষ্ঠ সখ্যতা তৈরি করেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক মন্ত্রী এমপি ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। এবং স্বল্প সময়ে পেয়ে যান একের পর এক পদম্নতি ২০১৬ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান।
ফয়সাল হালিম গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ -২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। একাধিক ঠিকাদারদের অভিযোগ দায়েরের পরেও তিনি কোন শাস্তির আওতায় পড়েননি বরং উল্টো পেয়েছেন পদোন্নতি।
২০১৯ সালে জামালপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালে একজন ঠিকাদার দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলী বরাবর অর্থ আত্মসাৎ প্রকল্পে অনিয়ম ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন কিন্তু সেটাও অদৃশ্য কারণে আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের শাস্তিমূলক বদলি করা হয় সেই তালিকায় ছিলেন ফয়সাল হালিম।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক চেয়ারম্যান বরাবর একজন ঠিকাদার অর্থ আত্মসাৎ ঘুষ কমিশন বাণিজ্য সহ নানা অভিযোগ উল্লেখ করে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুর প্রকল্পের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম ও সিলেটে কর্মরত সাবেক একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট পিপিআর-২০০৮ এবং এর সংশোধিত বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
এই প্রকল্পের লিফট, জেনারেটর এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আমদানির নামে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি ফান্ড তৈরি ও এই ফান্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের মালামাল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম সাজানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের ৮৩৬টি ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজের জন্য নিম্নমানের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা সাশ্রয় করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
আজিমপুরের প্রকল্পে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিভিন্নভাবে ভুয়া বিল ভাউচার করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবং এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন ফয়সাল হালিম। মাস্টাররোলে কর্মরত শ্রমিকদের ভুয়া তালিকা দেখিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। কিন্তু এগুলোর কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী বলেন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাদেরকে প্রাণনাশের হুমকি ও তাদের টেবিল থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করা হয়েছে।
পদে পদে ব্যয় বাড়িয়ে আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে এপিপি বরাদ্দের ১১০টি দরপত্র নিয়ম অনুযায়ী এলটিএম পদ্ধতিতে আহবান করেছেন ফয়সাল হালিম। কিন্তু তিনি তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিটি দরপত্রে সিন্ডিকেট করে তিন থেকে চারজনকে দরপত্রে অংশগ্রহণ করিয়েছেন অবৈধভাবে। ফয়সাল হালিম তাকে কমিশন দেওয়া ঠিকাদারের বাইরে অন্য ঠিকাদারদের দরপত্রে অংশগ্রগণ করার জন্য নিরুৎসাহিত করে তাদের ফাইলে স্বাক্ষর না করার ভয় দেখান বলে ভুক্তভোগীরা জানান। আজিমপুর কলোনির নতুন ভবন নির্মান প্রকল্পের আওতায় পুরাতন ভবনের সার্ভে রিপোর্ট করানোর অভিযোগ ও সামনে এসেছে। এই সার্ভে রিপোর্টের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে সরকারি রাজস্বে নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি হাতিয়ে নিয়ে নিলাম করার অভিযোগ উঠেছে ।
অভিযোগকারী অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করেন দুর্নীতি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ নানা অনিয়ম করে ক্রয় করেছেন বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ। পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে বেনামে ফয়সাল হালিম ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক একাউন্ট ও সম্পদের তথ্য যাচাই করলে প্রচুর অবৈধ সম্পদ বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগপত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের নামে পূর্বেও অনেকবার অনেক অভিযোগ এসেছে কিন্তু তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ কখনো আলোর মুখ দেখেনা তার অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবের কারণে। অবৈধ অর্থ দিয়ে তিনি সবকিছু ধামাচাপা দিয়ে দেন।
কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী বলেন প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম কখনো গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে কথা বলেন না, ফোন রিসিভ করেন না এবং তার সামনে গেলেও অনেকের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ করেননি এমনকি খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
