শিরোনাম

এতিমদের নামে অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: ইসলামী আন্দোলনের নেতা ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ

 প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৭ অপরাহ্ন   |   অপরাধ

এতিমদের নামে অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: ইসলামী আন্দোলনের নেতা ফারুক হোসেনের  বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ

মো. রাজু  (পটুয়াখালী) : 

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের চারাবুনিয়া গ্রামে অবস্থিত ‘ফারুকিয়া শিশু সদন ও এতিমখানা’কে ঘিরে অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ফারুক হোসেন মাস্টার, যিনি ইসলামী আন্দোলন মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে নিজ গ্রামে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে ‘ফারুকিয়া শিশু সদন ও এতিমখানা’ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করেন ফারুক হোসেন মাস্টার। পরবর্তীতে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলেও ধীরে ধীরে তা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সভায় পটুয়াখালী জেলা গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহ আলম শিকদার এই দুর্নীতির বিষয়টি উত্থাপন করলে সভায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক মোঃ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, “এতিমদের টাকা নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। অতি দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত সত্যতা উন্মোচন করা হবে।”

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি অনুদান গ্রহণে নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে আসছে। শুরুতে ১৭০ জন এতিম শিক্ষার্থীর তালিকা দেখিয়ে ৮৫ জনের বিপরীতে মাথাপিছু ২ হাজার টাকা হিসেবে মাসে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হতো। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ অনলাইন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির পর ১০০ জনের তালিকা দেখিয়ে ৫৭ জনের নামে মাসে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে প্রতিষ্ঠানে ১০–২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ জন শিক্ষার্থীর নামে অনুদান উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৭ জন দেখানো হলেও সরেজমিনে মাত্র ৭–১৫ জন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে। পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থী ‘ভাড়া করে’ এনে উপস্থিত দেখানো হয়। পটুয়াখালী শহরের অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের শিক্ষার্থী সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর মাতব্বর বলেন, “অনেক বছর ধরে মাদ্রাসাটির নাম শুনি, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো ছাত্র দেখি না। বছরে দুইবার অনুষ্ঠান হলে তখন বাইরে থেকে ছাত্র আনা হয়।” শামসুল হক তালুকদার বলেন, “শুরুর দিকে মানুষ পাশে থাকলেও এখন অনিয়মের কারণে কেউ আসে না। বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।” মোহাম্মদ বনি আমিন বলেন, “বছরে দুইবার মাহফিল করে বড় অঙ্কের টাকা তোলা হয়। আর এতে সহযোগিতা করছেন কিছু নামধারী আলেম যারা এ থেকে একটা অংশ ভাগ নেন। 

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামের দায়িত্বকালীন সময়ে অনুদান অনুমোদন ও উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি কলাপাড়া উপজেলায় কর্মরত।  উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ অলিউল্লাহ বলেন, “আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র এক মাস হয়েছে। আমি এখানে এসেই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বেশ অনিয়ম ও টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগ পেয়েছি এবং আপনাদের কাছ থেকে আজকে সরাসরি শুনলাম। আমি তদন্ত করে আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ও অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” 

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক এস এম শাহজাদা বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে একটি মনিটরিং টিম আছে, তারাই এসব দেখাশোনা করেন। অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করা হয়। দোষ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি গোপন রাখতে তাকে প্রথমে অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাতে রাজি না হলে হামলা-মামলার এবং বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি অভিযুক্ত সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠকের ব্যবস্থাও করা হয় বলে জানা গেছে। 

অভিযুক্ত ফারুক হোসেন মাস্টার প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে বলেন, “সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বরাদ্দ দেন, আমি জোর করে নিই না। তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীরা রয়েছে, তবে অনেকেই ছুটিতে আছে। এটি একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার।”

ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা মুজাহিদ কমিটির সভাপতি মাওলানা আবুল হাসান বুখারী বলেন, “এটি ব্যক্তিগত অভিযোগ। এর দায় সংগঠন নেবে না। তবে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতিমদের অর্থ আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই।” জেলা শাখার সভাপতি মোঃ সেলিম হাওলাদার বলেন, “ইসলামী আন্দোলন একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল। সেই দলের নাম ভাঙিয়ে সেখানে এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে—এমন জঘন্য অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ও আইনগত এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” 

জেলা শাখা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবুল বাশার বলেন, “আমরা ব্যক্তি নয়, ন্যায়বিচার চাই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাড় দেওয়া হবে না।”

দৈনিক অর্থনীতি কাগজ পত্রিকার পটুয়াখালী প্রতিনিধি মো. রাজুর অনুসন্ধানে উঠে আসে এই অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র। তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি গোপনে এলাকায় অবস্থান করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দা, আশপাশের প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এমনকি তরমুজ ক্রেতা পরিচয়ে এলাকায় অবস্থান করে তথ্য যাচাই করেন। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিনি নিশ্চিত হন—প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এতিম শিক্ষার্থী নেই। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করে এ বিষয় বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি পটুয়াখালী সদরের সাধারণ সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ গনি শিকদারকে অবহিত করা হয়। তিনি তার উর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের জানাবেন বলে জানান। জেলা মুজাহিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হেদায়েতুল্লাহ জেহাদীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনিও বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে তারা গোপনে তাদের অফিসে জরুরি বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও তা গোপন রেখে বিষয়টি যেন প্রকাশ্যে না আসে, সে জন্য সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ তুলে মামলা দেওয়ার কথাও আলোচনা হয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। পরে জেলা মুজাহিদ কমিটির সভাপতি মাওলানা আবুল হাসান বুখারীকে পুনরায় ফোন দিলে তিনি বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “সাংবাদিকরা আমাদের বন্ধু। সাংবাদিকদের কারণে আমরা সত্য ঘটনা জানতে পারি। তাদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর জেলা জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতিমদের নামে অনুদান আত্মসাৎ শুধু দুর্নীতিই নয়, এটি একটি মানবিক অপরাধ—যার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অপরাধ এর আরও খবর: