শিরোনাম

খুলনা বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক উসমান সরওয়ার আলমের নেতৃত্বে চলছে লাগামহীন ঘুষ দুর্নীতি

 প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৩ অপরাহ্ন   |   অপরাধ

খুলনা বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক উসমান সরওয়ার আলমের নেতৃত্বে চলছে লাগামহীন ঘুষ দুর্নীতি


নিজস্ব প্রতিবেদক : 

খুলনা নগরীর বাদামতলা শিরোমণি এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) অফিসে চলছে লাগামহীন ঘুষ দুর্নীতি । ভেতরে-বাইরে এককাট্টা হয়ে দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দালালচক্র। ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয় না এখানে। এই চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:) উসমান সরওয়ার আলম। 

বিআরটিএ এর খুলনা জেলা কার্যালয়ে জেঁকে  বসেছে দুর্নীতি। যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন, ফিটনেস,ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবা পেতে সেবাপ্রার্থীদের পদে পদে ঘুষ দিতে হচ্ছে। এবং এই ঘুষের লেনদেন গুলো দালালদের মাধ্যমে সম্পাদন হয়। এবং এই দুর্নীতি অনিয়মের সাথে জড়িত অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী যার কারণে কোন অভিযোগ দিলেও তা কখনো কার্যকর হয় না। বিআরটিএ জেলা কার্যালয়ে দায়িত্বরত অফিস কর্তা ব্যক্তিদের আশকারায় দালালদের দৌরাত্ব দিন দিন বাড়ছে । সাধারণ মানুষ এই সিন্ডিকেট এর কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন।


একাধিক ভুক্তভোগীর কাছে সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে জানতে চাইলে তারা অভিযোগ করে বলেন ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিটসহ যেকোনো সেবা পেতে হলে দিতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। অফিসের বাইরে প্রকাশ্যে অবস্থান করা দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কর্মকর্তারা গ্রাহকদের হয়রানি করছেন এবং ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন বাসের রুট পারমিট পেতে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা, নবায়নের জন্য ৩-৪ হাজার টাকা। আর ঘুষ দিতে না চাইলে মডেল আউট বলে হয়রানি করা হয়। ট্রাকপ্রতি ৩-৫ হাজার, সিএনজি ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। রেজিস্ট্রেশন শাখায় মালিকানা পরিবর্তণের জন্য গাড়ি প্রতি ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। ফিটনেস প্রদানে সিএনজি ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা, ট্রাক ১৮০০ থেকে ২০০০, হিউম্যান হলার ৪ থেকে ৫ হাজার, ফোরস্ট্রোক থেকে ২৫০০ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে চুক্তি করতে হয়। চুক্তি না হলে ফেল করানো হয়। 

একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে গতবছর ৭ মে ২০২৫ তারিখে দুদকের সহকারী পরিচালক  মাহমুদুল হাসান শুভ্রর নেতৃত্বে ছদ্মবেশে একটি অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং আব্বাস আলী নামে একজন দালালকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল যদিও অভিযোগ আছে এই অভিযানের কথা আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। 


আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে খুলনা বিআরটিএ অফিসে এই ঘুষ বাণিজ্যর সঙ্গে জড়িত আছে অধিকাংশ আনসার সদস্য, অফিস সহায়ক আব্দুল গাফফার, রাজিব আহমেদ পলাশ, উচ্চমান সহকারি রেজওয়ানুল ইসলাম, সরকারি মটর জান পরিদর্শক দাউদ হোসেন, মোটরযান পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম, সাইফুর রহমান সহ আরো অনেকে আর এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সহকারী পরিচালক উসমান সরওয়ার আলম। অধিকাংশ ঘুষ লেনদেন গুলো অফিসের বাহিরে ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।


কে এই উসমান সরওয়ার আলম?

কক্সবাজার সদর পৌরসভার মোজাহের পাড়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দরিদ্র কৃষক মরহুম আনোয়ার হোসেনের ছেলে সরওয়ার উসমান আলম, ২০০৬ সালে বিআরটিএ  যোগদান করেন, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরপরই জড়িয়ে পড়েন ঘুষ দুর্নীতি আর অনিয়মে। অবৈধ অর্থ তৈরি করেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ। বাবা আনোয়ার হোসেনের ভাঙ্গা কুড়ে ঘর ভেঙে নির্মাণ করেছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি। কক্সবাজার সদরে রয়েছে তার একাধিক ফ্লাট প্লট, আছে কক্সবাজার পর্যটন কেন্দ্রে একাধিক হোটেলের মালিকানার শেয়ার, ঘুষ দুর্নীতির অর্থে প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদ ক্রয় করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকউন্টে নামে বেনামে রয়েছে  বিপুল পরিমাণ অর্থ। আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য অধিকাংশ সম্পদ ক্রয় করেছেন স্ত্রী সন্তান সহ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে বেনামে। 

ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক উসমান সরওয়ার আলম, স্ত্রী মাহবুবা ফেরদৌসী সিদ্দিকী মুন্নি, সন্তান ইবতিসাম আবির ইউসা,ইফরায়ীম জারিফ দাইয়ানের নামে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে সম্পদের চিঠি প্রেরণ করেছে।


সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামানের মুঠো ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু খুলনা নয়  বিআরটিএর অফিসেগুলোতে সেবা পেতে যে হয়রানি হতে হয় তার কোন সুরাহা কর্তৃপক্ষ করেন না। যারা ঘুষ বাণিজ্য,দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করেন তাদের বলার মতো কোন শাস্তি হয়না। ফলে এ সেবাখাতটি দিন দিন অনিয়মের খাতে পরিনত হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত। বিআরটিএর দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


এই বিষয়ে জানতে খুলনা বিআরটিএ র সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি) উসমান সরওয়ার আলমের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অপরাধ এর আরও খবর: