শিরোনাম

​ফুলবাড়িয়া মার্কেটের পার্কিংয়ে অবৈধভাবে চলছে শতকোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য

 প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন   |   অপরাধ

​ফুলবাড়িয়া মার্কেটের পার্কিংয়ে অবৈধভাবে চলছে  শতকোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক :    

রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবনের একদম সন্নিকটে অবস্থিত ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২। ডিএসসিসির নাকের ডগায় বসেই এ মার্কেটে ম্যাজিস্ট্রেটের লাগানো সিলগালা করা তালা ভেঙে গত দুই মাসে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় এক হাজার অবৈধ দোকান। মার্কেটের তিনটি ভবনের বেজমেন্টে বা গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় এ বিশাল কর্মযজ্ঞ চললেও সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি, রাজস্ব বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রকাশ্যেই কার পার্কিং ভেঙে বিনা বাধায় গড়ে তোলা হয়েছে এসব দোকান, যা বর্তমানে শতকোটি টাকায় বিক্রি করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। মার্কেট সমিতির নেতাদের অভিযোগ, পুরোনো সিন্ডিকেট মার্কেট সমিতির সাবেক সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু ও সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ চক্রের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও করপোরেশনের কর্মকর্তারাও এই কাজে জড়িত। 

জানা যায়, ২০২০ সালে এই মার্কেটের বেজমেন্টে থাকা ৯১১টি অবৈধ দোকান উচ্ছেদে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। পরে আদালত ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত জায়গায় পুনর্বাসনের আদেশ দেন। এরপর উচ্চ আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে গত জুলাইয়ে আপিল করা হয়। তবে মার্কেটের দুষ্টু চক্র এর মধ্যেই ফের মার্কেটে অবৈধ দোকান নির্মাণ করতে কয়েকবার উদ্যোগ নেয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরে তিনবার মার্কেটে অবৈধ দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ চালু রাখতে পারেনি এ চক্র। সর্বশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর মার্কেটে অবৈধ দোকান নির্মাণের কাজ শুরু হলে ডিএসসিসির তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে উচ্ছেদ অভিযানে গেলে ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর হামলা করে। পরদিন ২৪ ডিসেম্বর আবার করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে গিয়ে মার্কেটের তিনটি ভবনের বেজমেন্টের সবকটি প্রবেশমুখ সিলগালা করে দেয়। তবে দুষ্টু চক্রটি সেই সিলগালা ভেঙে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাসের মধ্যেই তিনটি ভবনে প্রায় ১ হাজার দোকান নির্মাণ করেছে। অথচ এ সময় করপোরেশনের কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থাই নেননি। 

সরেজমিন দেখা যায়, ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২-এর জাকের প্লাজার (ব্লক-সি) নির্মাণকাজ শেষ। গত মঙ্গলবার থেকে বেজমেন্টের দোকান চালু করা হয়েছে। এরই মধ্যে এই ভবনের প্রায় তিনশ দোকানের মধ্যে ১০-১৫টি দোকানে মালপত্র উঠিয়ে চালু করা হয়েছে। সিটি প্লাজা (ব্লক-এ) ও নগর প্লাজা (ব্লক-বি) ভবনে আরও সাতশ দোকান নির্মাণ শেষে এখন চলছে ফিনিশিংয়ের কাজ।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনটি মার্কেটের বেজমেন্টের কার পার্কিং ইজারা নিয়ে ২০২৪ সাল থেকে আদালতে মামলা চলমান। সেসময় সব কার্যক্রম শেষ করেও ইজারা দিতে পারেনি করপোরেশন। তবে বেজমেন্ট সিলগালা করার আগে সাবেক কাউন্সিলর মো. মামুনের লোকজন তিনটি মার্কেটের কার পার্কিংয়ের টাকা তুলত। এখন দোকান নির্মাণ শেষে ২০২০ সালের ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ৭-১০ লাখ টাকায় এবং নতুনদের কাছে ১৫-২০ লাখ টাকায় প্রতিটি দোকান বিক্রি করা হচ্ছে।

তিন মার্কেটে অবৈধ দোকান আরও ২১০টি: ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, গত জুলাইয়ে করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এর সিটি প্লাজা (ব্লক-এ), নগর প্লাজা (ব্লক-বি), জাকের প্লাজা (ব্লক-সি) সরেজমিন পরিদর্শন করে। এ মার্কেটে করপোরেশনের বরাদ্দকৃত দোকান আছে ব্লক-এ তে ১৭৬টি, ব্লক-বি তে ১৭৬টি ও ব্লক-সিতে ১৭৯টি। তবে বরাদ্দকৃত দোকানের বাহিরে মার্কেট সমিতির নেতারা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মিলে মার্কেটের সিঁড়ির নিচে, টয়লেট ভেঙে, লিফটের সামনে, ফাঁকা জায়গায় আরও ২১০টি অবৈধ দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ব্লক-এ তে নিচ তলায় সিঁড়ির নিচে, লিফটের পাশে ফাঁকা জায়গায় দোকানের সামনে নকশাবহির্ভূত ৪১টি অবৈধ দোকান রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় ২২টি, তৃতীয় তলায় ৮টি, চতুর্থ তলায় ২টি, পঞ্চম তলায় ১৬টি দোকান আছে। ব্লক-বি তে নিচতলায় ৪০টি, দ্বিতীয় তলায় আছে ১২টি, তৃতীয় তলায় ২টি, চতুর্থ তলায় ৩টি, পঞ্চম তলায় ২টি দোকান আছে। ব্লক-সি তে নিচ তলায় ৩৩টি, দ্বিতীয় তলায় ১৭টি দোকান আছে। এদিকে গত ২৭ নভেম্বর সিটি মার্কেটে নিচতলার একটি টয়লেট ভেঙে ফের আরেকটি দোকান নির্মাণের অভিযোগ ওঠে মার্কেটে সমিতির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সরকার পতনের পরেও মার্কেট সমিতি ফাঁকা স্থানে দোকান নির্মাণ করে ২০ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে।


 তালা ভেঙে করপোরেশনের দোকান ভাড়া: ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এর নগর প্লাজা ও সিটি প্লাজার মার্কেট দুটির পাঁচতলা পর্যন্ত করপোরেশন দোকান বরাদ্দ দিলেও ছয়তলা থেকে আটতলা পর্যন্ত নির্মিত ৬৮৪টি দোকানের কোন দোকান বরাদ্দ এখনো হয়নি; কিন্তু সরেজমিন নগর প্লাজা ও সিটি প্লাজা মার্কেট ঘুরে দোকানগুলো গোডাউন হিসেবে ভাড়া ব্যবহার করতে দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এ দোকানগুলোর তালা ভেঙে ভাড়া দিয়েছে নিজ নিজ মার্কেট সমিতি।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক নেতারাও: করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাইদ খোকনের আমলে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এর বেজমেন্টে, ফুটপাত, সিঁড়ি, গলি, টয়লেট, লিফটের জায়গায় নকশাবহির্ভূত ৯১১টি দোকান বসায় মার্কেট সমিতির তৎকালীন সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু ও সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ। জানা যায়, ২০২০ সালে এসব দোকান উচ্ছেদের পর দেলু-ফিরোজ চক্র ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ওমর বিন আবদাল আজিজ তামিম, দোকান মালিক সমবায় সমিতির সহসভাপতি শাহ আলম চৌধুরী, জাকের মার্কেট সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শ্রমিক লীগের সহসভাপতি সহিদুর রহমান, মেয়রের তাপসের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাছিরুল হাসান সজীব, করপোরেশনের অঞ্চল-৪-এর তৎকালীন বাজার ও বিবিধ রাজস্ব পরিবীক্ষণের রাজস্ব কর্মকর্তা মিয়া জুনায়েদ আমিন, কর কর্মকর্তা আনিসুর রহমান এবং বাজার সুপারভাইজার হাবীবুর রহমান সিন্ডিকেট করে ফের নকশাবিহীন অবৈধ দোকান বসান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতারা পালিয়ে গেলেও দেলু-ফিরোজ চক্র এখনো বহাল তবিয়তে।

তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ মার্কেটে দোকান নির্মাণের বেশিরভাগ খরচ বহন করেন ফিরোজ আহমেদ। আর তার সঙ্গে ছিলেন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. মামুন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নেতা সৈয়দ মুকিতুল আহসান রঞ্জু, স্থানীয় ইউনিট জামায়াতের সভাপতি আলী হাসান সুমন, কাউন্সিলর মামুনের কর্মী মো. হানিফ বাচ্চু, তাজুল ইসলাম, মো. হানিফ, মালেক, সিদ্দিক, আয়ুব নবী ও ডালিম। ৫ আগস্টের পরে দোকান বরাদ্দের অনিয়ম নিয়ে নানান অভিযোগ উঠলে অঞ্চল-৪ বাজার সুপারভাইজার হাবীবুর রহমানকে অঞ্চল-৩-এ বৈদ্যুতিক লাইনম্যান পদে বদলি করা হলেও ফের ২৭ নভেম্বর তাকে অঞ্চল-৪ এ বদলি করা হয়েছে। করপোরেশনের এই কর্মকর্তা আবারও সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।


 ফুটপাতে ৪৫০ দোকানে প্রতিদিন চাঁদা ওঠে লক্ষাধিক টাকা: এই তিনটি মার্কেটের নকশাবিহীন দোকান নির্মাণের সঙ্গে মার্কেটের সামনের ফুটপাতজুড়ে প্রায় ৪৫০ দোকান বসিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের ব্যানারে দেলু-ফিরোজ চক্র। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা করে লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজি করা হয়। এসব চাঁদা উত্তোলনের সঙ্গে মোয়াজ্জেম, ডলার রাসেল, রিয়াজ, বাকের, ইব্রাহিম, মান্নান, শরীফ, হানিফ ও দুলাল নামে কয়েকজন জড়িত বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

সিটি প্লাজা মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান একাধিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সমিতি এই মার্কেট নির্মাণের সঙ্গে জড়িত নয়, আগে যাদের দোকান এখানে ছিল তারাই দোকান নির্মাণ করেছে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারাসহ সিটি করপোরেশনের লোকজনও জড়িত।’

 ফুলবাড়িয়া নগরপ্লাজা মার্কেট সমিতির সভাপতি মো. হানিফ বাচ্চুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন  ‘এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ফিরোজ আহমেদ এবং আন্ডারগ্রাউন্ডের দোকানদাররা। এর সঙ্গে সমিতি জড়িত না। সম্পূর্ণ অবৈধ প্রক্রিয়ায় তারা দোকান নির্মাণ করছে।’

ফুলবাড়িয়া মার্কেটের তিনটি ভবনের মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা বলেন, ‘সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু এই মার্কেটে ফিরোজ-দুলু চক্র থাকে বহাল তবিয়তে। সিলগালা মার্কেটে প্রকাশ্যেই তারা দোকান নির্মাণ করেছে। এখন এসব দোকান ৭ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে তারা। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবসায়ীদের তারা বলছে পাশের সুন্দরবন স্কয়ারের পঞ্চম তলা অবৈধভাবে নির্মাণ করেছিল সিন্ডিকেট। এই তলার প্রায় ৫০০ দোকান এখন বৈধ করার প্রক্রিয়া চলছে, ফুলবাড়িয়া মার্কেটের কার পার্কিংয়ের দোকানও একই প্রক্রিয়ায় বৈধ করা হবে।’

 ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মামুন একটি গণমাধ্যমকে  বলেন, ‘মার্কেটে আমি যাই না। আমি এর সঙ্গে জড়িত না।’ সিটি প্লাজা মার্কেট সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ আপনার ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ দোকান নির্মাণ করছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ জায়গার মালিক করপোরেশন, ক্ষতিগ্রস্তরা ভাড়াটিয়া। সাধারণ ভাড়াটিয়ারা আন্দোলন সংগ্রাম করে এসব করেছে। আমি কিছু জানি না।’

এ বিষয়ে যুবদল নেতা মুকিতুল আহসান রঞ্জু ও ফিরোজ আহমেদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি।

ক্ষতিগ্রস্তদের মামলায় করপোরেশনের আইনজীবীর আদালতে আইনি মোকাবিলা না করার অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা রুহুল আমিন গণমাধ্যমকে  বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। যদি কোনো মামলার আইনজীবী সেটি মোকাবিলা না করে তখন আমরা এসব মামলা অন্য আইনজীবীর কাছে স্থানান্তর করে দিই। বর্তমানে এই মার্কেট-সংক্রান্ত তিনটি মামলা উচ্চ আদালতে রিভিউ পর্যায়ে আছে। এসব মামলায় আমাদের আইনজীবীরা মোকাবিলা করছেন।’

করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোবাশ্বের হাসান গনমাধ্যমে বলেন, ‘মার্কেটের অবৈধ উচ্ছেদ করতে আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে সিলগালা করেছে। এ মার্কেট নিয়ে এখনো দুটি মামলা চলমান। আমরা খবর পেয়েছি সেখানে সিলগালা মার্কেটে অবৈধ দোকান নির্মাণ চলছে। এসবের ছবি ভিডিও আমরা আদালতে পেশ করব।’ করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ গনমাধ্যমে বলেন‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই।’

অপরাধ এর আরও খবর: