বিশেষ চক্রের কবজায় ডিপিডিসি!
• এমডি নিয়োগে ‘বিতর্কিত’ মানদণ্ডে বঞ্চিত অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা
• নিমজ্জিত হচ্ছে প্রশাসনিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলায়
• ভেঙে পড়ার উপক্রম সংস্থাটির চেইন অব কমান্ড
• অস্থিতিশীল করে স্বার্থ হাসিলে মরিয়া বিশেষ চক্র
হাসান মাহমুদ রিপন :
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)— দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটি বর্তমানে এক চরম প্রশাসনিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার আবর্তে নিমজ্জিত। দীর্ঘদিনের শূন্য পদ, ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ নির্ভর প্রশাসন এবং বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের একচ্ছত্র আধিপত্যে সংস্থাটির চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে ডিপিডিসিকে অস্থিতিশীল করে নিজেদের রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ জট:
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপিডিসির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ১৯টি পদের মধ্যে ১০টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে হয় প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, অথবা সংস্থারই অন্য কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দায়সারাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন), নির্বাহী পরিচালক (এডমিন অ্যান্ড এইচআর) এবং কোম্পানি সচিবের মতো শীর্ষ পদগুলো স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। এছাড়া ৩ জন মহাব্যবস্থাপকের মধ্যে ২ জন এবং ১০ জন প্রধান প্রকৌশলীর মধ্যে ৪ জনের পদÑই শূন্য। এই শূন্যতার সুযোগে অনেক কর্মকর্তা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করছেন। যা সংস্থার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে স্থবির করে দিয়েছে।
বৈষম্যের শিকার নিগৃহীত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা:
বিগত সরকারের আমলে যারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উল্টো অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিষ্ট আমলের সুবিধাভোগীরাই এখন নব্য বেশে ডিপিডিসি নিয়ন্ত্রণ করছে। যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে, যা সংস্থার সার্বিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিপিডিসির একাধিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী জানিয়েছেন, পতিত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আস্থাভাজন ও বিশেষ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের চক্র বর্তমানে সংস্থায় ছড়ি ঘোরাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সংস্থার উন্নয়নের চেয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী।
ডিপিডিসির আলোচিত চরিত্রের একাংশ:
মোহাম্মদ হায়দার আলী (নির্বাহী পরিচালক-অর্থ): তিনি নিজের পদের পাশাপাশি নির্বাহী পরিচালক (এডমিন অ্যান্ড এইচআর)-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংস্থায় বিশেষ রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। এভাবে রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের অনেক সদস্যই সংস্থার গুরুত্বপূর্ন পদের দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। এ ব্যাপারে ডিপিডিসি’র নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ হায়দার আলীর মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।
মোহাম্মদ হাসানাত চৌধুরী (জিএম-এইচআর): তিনি একইসঙ্গে মহাব্যবস্থাপক (এইচআর) এবং অতিরিক্ত হিসেবে কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে অধীনস্থদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজের দপ্তরে ‘অটোলক’ ব্যবহার করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন বলে জানা গেছে। অসহযোগিতামূলক আচরণ ও গত সরকারের শীর্ষ মহলের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে সংস্থার ভেতরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
এমডি নিয়োগে ‘বিতর্কিত’ মানদণ্ড:
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডিপিডিসির এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘মেধাবীদের পথ রুদ্ধ করার কৌশল’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ প্রকৌশলীরা।
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির পর জারি করা প্রজ্ঞাপনে এমডি পদের যোগ্যতার শর্ত এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, ডিপিডিসির নিজস্ব অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশই আবেদনের যোগ্যতা হারিয়েছেন। অথচ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) আগের অভিজ্ঞতার শর্তই বহাল আছে। প্রকৌশলীদের দাবি, আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই এমডি পদে আবেদন করা যেত, যা এখন অত্যন্ত জটিল করা হয়েছে।
সংস্থাটির ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীরা বলেন, সারা জীবন ডিপিডিসিতে নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করেছি। প্রাথমিক যোগ্যতা থাকার পরও মানদণ্ড সংশোধন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির এমডি পদে আবেদনই করতে পারলাম না। এর ফলে মেধাবীদের জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হলো বলে মনে করেন তাঁরা।
এই সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিয়ে গত বছরের ২৩ জুলাই পুরোনো গাইডলাইনেই এমডি নিয়োগের সার্কুলার জারি করে ডিপিডিসি। এর প্রেক্ষিতে ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর একই বছরের ৩০ জুলাই চিঠি দেন। চিঠিতে তাঁরা বিদ্যুৎ বিভাগের গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা অফিস আদেশ ও ২৯ এপ্রিলের সংশোধিত প্রজ্ঞাপনের আলোকে ডিপিডিসিসহ বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিসমূহের চলমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত ও গাইডলাইন সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছেন। পাশাপাশি, কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ, অসম প্রতিযোগিতা, বৈষম্য ও জটিলতা নিরসনের স্বার্থে তিনটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন প্রকৌশলীরা। প্রস্তাবগুলো হলো-
১. অভিজ্ঞতার সমন্বয়: ডিপিডিসি সার্ভিস রুল অনুযায়ী বিতরণ, সঞ্চালন বা উৎপাদন ইউটিলিটিতে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতার বিধান বহাল রাখা।
২. গ্রেড বৈষম্য দূরীকরণ: সরকারি গ্রেড-৪ বা তদুর্ধ্ব পদে চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত স্টেট ওনড কোম্পানিগুলোর (SOCÕs) ক্ষেত্রেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
৩. চাকরি কাল নির্ধারণ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের জন্য কারিগরি ও প্রশাসনিক যোগ্যতার গুরুত্ব বিবেচনায় উভয় ক্ষেত্রেই মোট অভিজ্ঞতার সময়কাল ২৫ বছর নির্ধারণ করা।
এমডি নিয়োগের মানদন্ডের ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না দাবি করে ডিপিডিসি’র পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোঃ হামিদুর রহমান খান বলেন, মন্ত্রনালয় থেকে ঘোষিত নিয়োগ বিধি অনুসারেই নিয়োগ হবে। এছাড়া ডিপিডিসি’র শূন্য পদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব সংস্থাটির এমডি’র। তাই এ ব্যাপারে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দায়িত্বে রয়েছি অল্প কিছুদিন হলো, সংস্থায় সিন্ডিকেটের বিষয় আমার কিছু জানা নেই। তবে ব্যাতিক্রম বা বে-আইনী কোনো কিছু আমার নজরে এলে অবশ্যই সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
এ ব্যাপারে ডিপিডিসি’র এমডি নূর আহমদের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমান সরকার জনগনের অর্থ লুটপাট কিংবা জনভোগান্তী বাড়াবে এমন কোনো ব্যাক্তি অথবা সিন্ডিকেটকে বরদাশত করবে না। এ জাতীয় সিন্ডিকেটকে আমরা স্ব-মূলে নির্মূল করে ফেলবো।
তিনি বলেন, ব্যাক্তি বা দলীয় স্বার্থ হাসিলে কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠী বা চক্র যদি প্রতিষ্ঠান অথবা সংস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করে তাহলে তাদেরকে কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
ডিপিডিসির মতো একটি সংবেদনশীল ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানে যদি যোগ্য নেতৃত্বের অভাব থাকে এবং তা যদি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চারণভূমিতে পরিণত হয়, তবে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ গ্রাহক ও জাতীয় গ্রিডের ওপর পড়বে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনতিবিলম্বে বিতর্কিত নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় স্থায়ী কর্মকর্তাদের পদায়ন না করলে ডিপিডিসির প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। কেবল বাস্তবমুখী নীতিমালা এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনই পারে ডিপিডিসিকে এই ‘জগাখিচুড়ি’ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে।
