প্রাক বাজেট আলোচনায় বিসিআই সভাপতি’র যা বললেন
আজ ২২ এপ্রিল, ২০২৬, সকাল ১০:০০ টায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর চেয়ারম্যান সাথে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর প্রতিনিধিদলের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
অর্থনীতির কাগজের পাঠকদের জন্য বিসিআই সভাপতি’র উপস্থাপনা হুবহু তুলে ধরা হলো :
মাননীয় চেয়ারম্যান, এনবিআরের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সম্মানিত অতিথিবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।
আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ উপলক্ষে আমাদেরকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর সম্মানিত চেয়ারম্যান মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
আপনারা অবগত আছেন যে, বিসিআই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী একটি জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ চেম্বার। দেশের টেকসই কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শিল্প খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খাতের ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য শিল্পবান্ধব ও সহায়ক কর কাঠামো অপরিহার্য। আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এনবিআর একটি বাস্তবমুখী ও শিল্প সহায়ক করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পখাতকে কার্যকর সহায়তা প্রদান করবে। এ ক্ষেত্রে বিসিআই সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিসিআই নিয়মিতভাবে সদস্যদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা সংগ্রহ করে এবং বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করে এনবিআরের নিকট উপস্থাপন করে থাকে। আমাদের প্রস্তাবনা গুলো সব সময়ই বিনিয়োগ বান্ধব, প্রবৃদ্ধিমুখী এবং স্বচ্ছ বাজেট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
বর্তমানে শিল্পখাত জ্বালানি সংকট, এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর ফলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই বাস্তবতায়, শিল্পখাতের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা আরও উল্লেখ করতে চাই বর্তমানে Automation and Artificial Intelligence (AI), Industry 4.0 & Digitalization, Diversification into High-Value Sectors, Upskilling the Workforce and Green Manufacturing Processes ইত্যাদি বিষয় সমূহকে বাজেটে গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে সমূহে বরাদ্দবৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীদের এ সকল উদ্যোগে প্রনোদনার ব্যবস্থা করা জরুরী।
২০৩৪ সালে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রুপান্তর করতে আমাদের LDC graduation এর Shocks and consequences বিবেচনায় নিতে হবে পাশা পাশি আমরা রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও ধারাবাহিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য আমাদের Pharmaceuticals & APIs, Light engineering, Agro-Machinery, Automobiles, Electrical & electronics, Leather & footwear, IT & ITES, Halal products, Agro-processing and Plastics & packaging শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাত সমূহের সম্প্রসারণে যথাযথ আর্থিক ও নীতি সহায়তা দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন বলে আমরা মনে করছি।
১) আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বিসিআই-এর পক্ষ থেকে আমরা কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। শিল্পখাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের স্বার্থে উল্লিখিত বিষয়সমূহ সদয় বিবেচনার জন্য মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
i. শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য করারোপের ভিন্নতা পরিহার, যেমন- বড় প্রতিষ্ঠান সমূহ প্লাস্টিক উৎপাদনের Complete Mold আমদানি করলে তা Capital Machinery হিসাবে গন্য হয় এবং এর জন্য শুধুমাত্র Customs Duty ১% অপর দিকে এই একই মোল্ড তৈরীর কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে মাইক্রো ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে AT, AIT ও VAT বাবদ প্রায় ৩০% শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের উদীয়মান উদ্ভাবনী শক্তি সম্পন্ন উদ্যোক্তাগন শিল্প ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সাধনে সক্ষম হবেন।
ii. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য বিশেষ কর সুবিধা : এসএমই খাতের বিকাশের জন্য পৃথক কর হার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। টার্নওভার কর হ্রাস করা হলে এসএমই ব্যবসায়ীরা করের আওতায় আসতে উৎসাহিত হবে। দেশীয় উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করতে কাঁচামালের উপর ভ্যাট ও শুল্ক হ্রাস করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য ভ্যাটের ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা দেওয়া হলে, এই শিল্পের বিকাশ হবে এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। ভ্যাটের সকল হারের ক্ষেত্রে এই ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন । তাছাড়াও
• তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য বাজেটে বিশেষ তহবিল গঠন করার প্রস্তাব করছি;
• ক্ষুদ্র শিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাত ভিত্তিক যৌথ রপ্তানিমূখি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভাগ ভিত্তিক ২ থেকে ৩টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন সাপেক্ষে বন্ডেড-ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রদান করা;
• ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য কর পরিপালন সহজকরণ এবং কর নেটের আওতায় ক্ষদ্র ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহিত করার জন্য কর নির্ধারণ ও আয়কর পরিগণনা প্রক্রিয়া সহজকরণের প্রস্তাব করছি; এবং
• মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে সব ধরনের Utility র উপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করছি।
iii. ধারা ৫৬ (২) অনুযায়ী ধারা ৫৫ এর দফা (ধ) ও (ন) এর ক্ষেত্র ব্যতীত অন্যান্য দফার অধীনে অননুমোদিত সকল ব্যয় বিশেষ ব্যবসা আয় হিসাবে গণ্য হইবে। এর ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক খরচ হিসাবে হিসাবভুক্ত হলেও শুধুমাত্র খরচের অনুমোদনযোগ্য সীমাবদ্ধতা থাকায় অতিরক্তি খরচ বিশেষ ব্যবসা আয় হিসাবে গণ্য হয়। তার উপর সাধারণ কর হার আরোপযোগ্য। উদাহরণ স্বরূপ আপ্যায়ন খরচ ২০০,০০০ টাকা কিন্তু অনুমোদনযোগ্য খরচ ১৬০,০০০ টাকা মাত্র অতিরিক্ত ৪০,০০০ টাকা বিশেষ ব্যবসা আয় হিসাবে গণ্য হয়। কোম্পানীর কর্পোরেট রেট ১২% বা ১০% হলেও বিশেষ ব্যবসা আয়ের ক্ষেত্রে ২৫% / ২৭.৫০% হারে কর পরিশোধ করতে হয়।
এমতাবস্থায় আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৫৬(১) নিম্নোক্তভাবে পরিবর্তনের প্রস্তাব করছি। এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহাকিছুই থাকুক না কেন ধারা ৫৫ এর দফা (ঘ)-(ঞ), (থ), (ধ) ও (ন) ব্যতীত অন্যান্য দফার অধীনে অনুমোদিত সকল ব্যয় কে বিশেষ ব্যবসায়িক আয় হিসাবে গণ্য করা হবে।
iv. ধারা ৭০ (২) অনুযায়ী ব্যবসায়িক ক্ষতি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক আয়ের সাথে সমন্বয় করা যাইবে। কোম্পানীর ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ক্ষতি থাকলেও ব্যাংক সুদের উপর আলাদাভাবে কর আরোপ করা হয়। যাহা কোম্পানীর উপর অতিরিক্ত করের বোঝা বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষেত্রে ব্যাংক সুদ আয়ের সাথে ব্যবসায়িক ক্ষতি একই করবর্ষে সমন্বয়ের প্রস্তাব করছি।
v. ধারা ১০৪ অনুযায়ী নিবাসীর পরিশোধিত সুদ বা মুনাফার উপর ১০% হারে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। গ্রুপ অব কোম্পানীর ক্ষেত্রে ব্যাংক সাধারণত আর্থিকভাবে স্বচ্ছল প্রতিষ্ঠানকে লোন প্রদান করে থাকে। স্বচ্ছল প্রতিষ্ঠান গুলো ব্যবসায়িক কাজে মাঝে মধ্যে অস্বচ্ছল প্রতিষ্ঠান গুলোকে উক্ত লোনের কিছু অংশ স্বল্প সময়ের জন্য লোন হিসাবে দিয়ে থাকে।
আইন অনুযায়ী লোন সুদের আনুপাতিক অংশ দুই প্রতিষ্ঠানে খরচ হিসাবে হিসাবভুক্ত করেন। এই ক্ষেত্রে লোনের সুদ যখন ফেরত প্রদান করা হয় তখন ১০% হারে কর কর্তন করা যুক্তিক নয় কারণ উক্ত সুদ স্বচ্ছল কোম্পানীর আয় নয়। স্বচ্ছল কোম্পানী শুধুমাত্র তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে সুদের আনুপাতিক অংশ সংগ্রহ পূর্বক ব্যাংকে পরিশোধ করেন।
সুতরাং ১০৪ ধারায় সুদ বা মুনাফার উপর ১০% হারে কর কর্তনের বিধান বাতিল করার প্রস্তাব করছি।
vi. সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানোঃ আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৮৯ এবং উৎসে কর বিধিমালা ২০২৪ এর বিধি-৩ অনুযায়ী সরবরাহ পর্যায়ে ৫% উৎসে কর কর্তন করা বাধ্যতামূলক। তবে এই কর সমন্বয় করতে পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানিকে ২৫% (৫/২০%) এবং প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে ২০% (৫/২৫%) কর পূর্ববর্তী মুনাফা অর্জন করতে হয়, যা বর্তমান ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রায় অসম্ভব। আমরা সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর হার ৫% থেকে কমিয়ে ৩% করার প্রস্তাব করছি। পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানিকে ১৫% (৩/২০%) এবং প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে ১২% (৩/২৫%) কর পূর্ববর্তী মুনাফা অর্জন করতে হয়, যা তুলনামূলক ভাবে বাস্তবসম্মত এবং ব্যবসায়িক ভারসাম্য বজায় বাখতে সহায়ক হবে।
vii. রপ্তানির ক্ষেত্রে উৎসে কর কমানোঃ তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই অস্থিরতার ফলে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার ভারত, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার মত প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে স্থানান্তর করেছে। শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধ এবং শিপমেন্টে বিলম্বের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমে গেছে যা রপ্তানী আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এই সংকট মোকাবেলায় এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য রপ্তানি আয়ের উৎসে কর (TDS) ১ % থেকে কমিয়ে ০.৫% করার প্রস্তাব করছি।
viii. ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও টার্নওভারের উপর ১% হারে ন্যূনতম কর নির্ধারন করা হয়ে থাকে যা প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে দাড়ায়; আমারা উক্ত ন্যূনতম করের বিধান রহিত করনের প্রস্তাব করছি।
ix. আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ১৪৭ অনুযায়ী উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ নিশ্চিতকরণ ও যাচাইকরণের জন্য কর কমিশনার বা উপযুক্ত অন্যান্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ যাচাইয়ের লক্ষ্যে যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের রেকর্ড সহ সিস্টেমে প্রবেশ বা কম্পিউটারে রক্ষিত তথ্যাদি জব্দ, দখলে রাখা বা বিশ্লেষণ করতে পারবে। কিন্তু এই সংক্রান্ত কোন উপযুক্ত গাইডলাইন না থাকায় বিভিন্ন টীম বিভিন্নভাবে কাজ সম্পাদন করে। কেউ কেউ বিগত ৫ বছরের বা কেউ কেউ বিগত ৩ বছরের audited financial statements এবং তথ্য উপাত্ত নিয়ে কাজ করে। কিন্তু করদাতার যে বছরগুলোর কর নথি কর কর্মকর্তা দ্বারা নিয়মিত করনির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে, সে বছরগুলোও ধারা ১৪৭ এর আওতায় উৎসে কর কর্তন নিশ্চিতকরণ ও যাচাইকরণ অপ্রয়োজনীয়, কারণ নিয়মিত কর নির্ধারণের সময় এসকল খাত যথার্থভাবে বিবেচনা করেই কর নির্ধারণ সম্পন্ন হয়। সুতরাং, ধারা ১৪৭ এর অধীন গৃহীত কার্যক্রমের আওতা থেকে নিয়মিত কর নির্ধারণের বছরগুলো বাদ দেয়ার প্রস্তাব করছি। শুধু মাত্র চলতি বছরগুলোর জন্য ধারা ১৪৭ এর কার্যক্রম গৃহীত হলে তা কোম্পানির ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিতে এবং সংশোধন করতে সাহায্য করবে। ফলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।
x. উপযুক্ত ভিত্তি ছাড়াই ২১২ ধারায় মামলা পুনঃউন্মোচন বন্ধ করার নির্দেশনাঃ
ধারা ২১২ অনুযায়ী যদি উপ-কর কমিশনারের নিকট সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে যার প্রেক্ষিতে উপকর কমিশনারের বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে, করদাতার করদায় এড়াইয়া গিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে উপকর কমিশনার ২১২ ধারায় কার্যক্রম গ্রহণ করিতে পারিবেন। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে উপকর কমিশনার সুনির্দিষ্ট তথ্যের উল্লেখ না করে Administrative Expenses ও অন্যান্য খাতের খরচ যাচাইযোগ্য নয় বলে ২১২ ধারায় নোটিশ জারী করেন। যাহা সঠিক নয় বলে আামরা মনে করি।
উপরোক্ত বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করছি।
২) মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ সংক্রান্তঃ
ধারা ১২৭ মোতাবেক সুদ আরোপের বিধান স্পষ্টীকরণ করার প্রস্তাব:
‘‘নির্ধারিত তারিখ’’ বলতে কোন তারিখ বোঝাবে তা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা চূড়ান্ত কর নির্ধারণী আদেশে বর্ণিত তারিখ কে প্রদেয় হওয়ার তারিখ বিবেচনা করা হচ্ছে। ধারা ৭৩ (৪)-এ সুদ ধার্যের বিষয়ে প্রদেয় কর পরিশোধের মূল ধার্য তারিখ হতে হিসাব করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘‘পরিশোধের দিন পর্যন্ত’’ এর ব্যাখ্যায় নিষ্পন্নাধীন সময়কে অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। সুতরাং, নির্ধারিত তারিখ এর ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ১২৭ এর উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত ব্যাখ্যার পরিবর্তে নিম্নরূপ ব্যাখ্যা প্রতিস্থাপন করার প্রস্তাব:
ব্যাখ্যাঃ- এই উপ-ধারার নির্ধারিত তারিখ অর্থ কর প্রদেয় হওয়া ক্ষেত্রে ধারা ৩৩-এ বর্ণিত সময় এবং উৎসে কর্তন বা কর্তিত কর জমা প্রদান এর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিতে বর্ণিত তারিখ; এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদেশে বর্ণিত তারিখ; এবং পরিশোধের দিন পর্যন্ত অর্থ নির্ধারিত তারিখের পরবর্তী দিন হইতে নিষ্পন্নধীন সময়সহ পরিশোধের দিন পর্যন্ত, তবে ২৪ (চব্বিশ) মাসের অধিক নহে।
উপরোক্ত বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করছি।
৩) করের আওতা (Tax Net) বৃদ্ধি ও Tax-GDP Ratio বাড়ানো:
Tax Net সম্প্রসারন ও Tax-GDP Ratio বাড়ানোর জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা সমূহ গ্রহণের প্রস্তাব করছি-
i. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর তথ্য অনুযায়ী মার্চ ২০২৬ এ মোট টিআইএন ধারীর সংখ্যা ১,১৮,২০,৭১৫। অন্যদিকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন দাখিল সংখ্যা ৪৫,৫৮,২০৯। অর্থাৎ টিআইএন ধারীর ৩৮.৫৬% রিটার্ন দাখিল করেছে| ৬১.৪৪% টিআইএন ধারী আয়কর দাখিল করছেন না। আয়কর রিটার্ন খেলাপীদের যথাযথ রিটার্ন দাখিলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ii. ছোট ব্যবসায়ী ও পেশাজীবিদের সরল পদ্ধতির কর আরোপের জন্য ‘‘স্লট’’ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। আয়কর আইন ২০২৩ এর ১৯৫ ধারায় এই পদ্ধতি থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ভারতের আয়কর আইনেও একই বিধান আছে। এইসব স্লট এসেসমেন্ট স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন হলে আয়করের আওতা ও আয়কর সংগ্রহে সুফল পাওয়া যাবে।
iii. আইন অনুযায়ী পৌর এলাকা বা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যবসা বা পেশা পরিচালনার বেলায় ট্রেড লাইসেন্স এর প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে আয়কর আইন ২০২৩ এর ১৩১ ধারায় ট্রেড লাইসেন্স এর নবায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে উৎসে আয়কর সংগ্রহের বিধান আছে। কিন্তু লাইসেন্স গ্রহণ ও উৎসে আয়কর সংগ্রহ উভয় ক্ষেত্রে বিধান পরিপালনে ব্যাপক ঘাটতি আছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও পেশাজীবি অংশকে আয়কর কার্যক্রমের আওতায় আনার জন্য এই আইনের কার্যকর প্রয়োগের সুপারিশ করছি।
iv. ধারনা করা যায় যে কেবলমাত্র রাজউক এর আওতাধীন এলাকায় ৫.১৪ লক্ষ কংক্রীট এর দালান সহ ২১.৪৭ লক্ষ দালান আছে। চট্টগ্রাম শহরে দালান সংখ্যা ১.৮৩ লক্ষ বলে ধারণা করা যায়। অন্যান্য শহরে বিপুল সংখ্যক দালান আছে| আইন অনুযায়ী ভবনের নকশা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আবার আয়কর আইন ২০২৩ এর ২৬৪ ধারায় নকশা অনুমোদনের বেলায় আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দাখিলের বিধান আছে। কিন্তু অনেক ভবনের মালিক নকশা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ এসব বিধান পরিপালন করছেন না। এদের আয়কর কার্যক্রমের আওতায় আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
সম্মানিত চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), আমরা বিশ্বাস করি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্ব কেবল রাজস্ব আহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি ব্যবসাবান্ধব, বিস্তৃত ও টেকসই কর কাঠামো প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এমন একটি কর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যা দীর্ঘমেয়াদে পূর্বানুমানযোগ্য (predictable) হবে, ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা অধিক আত্মবিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতে পারবেন।
পরিশেষে, আমাদের বক্তব্য ধৈর্যসহকারে শোনার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। একই সাথে অর্থ বিভাগের সম্মানিত কর্মকর্তাবৃন্দ, যাদের নিরলস পরিশ্রমে এ বাজেট প্রণীত হচ্ছে, এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
ধন্যবাদান্তে,
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)
সভাপতি, বিসিআই
