শিরোনাম

ডিপিডিসিতে বহাল এমডি নিয়োগের সেই বিতর্কিত মানদন্ড : কথা রাখেনি মন্ত্রনালয়!

 প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ডিপিডিসিতে বহাল এমডি নিয়োগের সেই বিতর্কিত মানদন্ড : কথা রাখেনি মন্ত্রনালয়!

যোগ্য ও মেধাবী প্রকৌশলীর এমডি হওয়ার পথ বন্ধ

অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন ডিপিডিসি কর্মকর্তারা 

প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ গ্রাহক ও জাতীয় গ্রিডের ওপর 

সংশোধন না করলে ভেঙে পড়ার শঙ্কা প্রশাসনিক কাঠামো


হাসান মাহমুদ রিপন :

মেধা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে যে সকল কর্মকর্তারা ধাপে ধাপে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) কে উন্নতির শিখরে পৌছে দিচ্ছে। অথচ সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে উদ্দেশ্য প্রনোদিত বিতর্কিত এক মানদন্ড তৈরি করে তাদেরকেই এখন অধিকার বঞ্চিত করা হচ্ছে। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে করা এই মানদন্ডের বিরুদ্ধে প্রকৌশলীরা আন্দোলন করলেও তৎকালীন কর্মকর্তারা এতে ভ্রুক্ষেপ করেননি। যদিও পরবর্তিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছিলেন, শিগগিরই এমডি নিয়োগের গাইড লাইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয় আজও সেই কথা রাখেনি। বহাল রেখেছে এমডি নিয়োগের সেই বিতর্কিত মানদন্ড।

জানা যায়, গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগ এক ‘অতি জরুরি’ অফিস আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়,  বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর এমডি পদে আবেদনের জন্য প্রার্থীর কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী বা সমমানের এবং তদুর্ধ পদে থাকতে হবে কমপক্ষে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা। আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই এমডি পদে আবেদন করা যেত।

এই আদেশে ক্ষুব্ধ হন প্রকৌশলীরা। তাঁদের অভিযোগ, নানা জটিলতা পেরিয়ে একজন প্রকৌশলী চাকরি জীবনের শেষার্ধ্বে এসেই প্রধান প্রকৌশলী হতে পারেন। এ অবস্থায় তিন বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান গাইডলাইনে একজন যোগ্য ও মেধাবী প্রকৌশলীর এমডি হওয়ার পথ এভাবেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই মানদণ্ড সংশোধন অতীব জরুরি।

ডিপিডিসি প্রকৌশলীরা জানান, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে একটি মহল বিশেষ উদ্দেশ্যে তাদের ফায়দা হাসিলে ডিপিডিসি’র এমডি নিয়োগে সংস্থাটির স্বার্থ বিরোধী বিতর্কিত এই নিয়োগ মানদণ্ড জারি করে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এ ব্যাপারে বলেন, একটি সংস্থায় যদি দীর্ঘদিন কোনো কর্মকর্তা কর্মরত থাকেন তাহলে ঐ সংস্থাটির বিষয়ে তার বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। আর সেইসব কর্মকর্তাকেই যদি সংস্থাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে তিনি সংস্থা আর গ্রাহক সেবার মান উভয় উন্নয়ণেই ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আমি মনে করি।

এমডি নিয়োগের মানদণ্ড সংক্রান্ত এই জটিলতা তুলে ধরে এর প্রতিকার চেয়ে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানির প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ও কোম্পানিগুলোর বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। গত বছরের ৩০ জুলাই করা ঐ আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন দুইজন প্রধান প্রকৌশলী ও ১৮ জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। তাঁরা বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা অফিস আদেশ ও ২৯ এপ্রিলের সংশোধিত প্রজ্ঞাপনের আলোকে ডিপিডিসিসহ বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিসমূহের চলমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত ও গাইডলাইন সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছেন।

গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডিপিডিসির এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘মেধাবীদের পথ রুদ্ধ করার কৌশল’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ প্রকৌশলীরা।

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির পর জারি করা প্রজ্ঞাপনে এমডি পদের যোগ্যতার শর্ত এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, ডিপিডিসির নিজস্ব অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশই আবেদনের যোগ্যতা হারিয়েছেন। অথচ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) আগের অভিজ্ঞতার শর্তই বহাল আছে। প্রকৌশলীদের দাবি, আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই এমডি পদে আবেদন করা যেত, যা এখন অত্যন্ত জটিল করা হয়েছে।

সংস্থাটির ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীরা বলেন, সারা জীবন ডিপিডিসিতে নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করেছি। প্রাথমিক যোগ্যতা থাকার পরও মানদণ্ড সংশোধন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির এমডি পদে বিগত সময়ে আবেদনই করতে পারিনি। এর ফলে মেধাবীদের জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হলো বলে মনে করেন তাঁরা।

এই সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিয়ে গত বছরের ২৩ জুলাই পুরোনো গাইডলাইনেই এমডি নিয়োগের সার্কুলার জারি করে ডিপিডিসি। এর প্রেক্ষিতে ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর একই বছরের ৩০ জুলাই চিঠি দেন। চিঠিতে তাঁরা বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিসমূহের চলমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত ও গাইডলাইন সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছেন। পাশাপাশি, কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ, অসম প্রতিযোগিতা, বৈষম্য ও জটিলতা নিরসনের স্বার্থে তিনটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন প্রকৌশলীরা।

প্রস্তাবগুলো হলো- 

১. অভিজ্ঞতার সমন্বয়: ডিপিডিসি সার্ভিস রুল অনুযায়ী বিতরণ, সঞ্চালন বা উৎপাদন ইউটিলিটিতে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতার বিধান বহাল রাখা।

২. গ্রেড বৈষম্য দূরীকরণ: সরকারি গ্রেড-৪ বা তদুর্ধ্ব পদে চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত স্টেট ওনড কোম্পানিগুলোর (SOCÕs) ক্ষেত্রেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।

৩. চাকরি কাল নির্ধারণ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের জন্য কারিগরি ও প্রশাসনিক যোগ্যতার গুরুত্ব বিবেচনায় উভয় ক্ষেত্রেই মোট অভিজ্ঞতার সময়কাল ২৫ বছর নির্ধারণ করা।

এমডি নিয়োগের মানদন্ডের ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না দাবি করে ডিপিডিসি’র পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোঃ হামিদুর রহমান খান বলেন, মন্ত্রনালয় থেকে ঘোষিত নিয়োগ বিধি অনুসারেই নিয়োগ হবে। এছাড়া ডিপিডিসি’র শূন্য পদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব সংস্থাটির এমডি’র। তাই এ ব্যাপারে তিনিই ভালো বলতে পারবেন। 

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দায়িত্বে রয়েছি অল্প কিছুদিন হলো, সংস্থায় সিন্ডিকেটের বিষয় আমার কিছু জানা নেই। তবে ব্যাতিক্রম বা বে-আইনী কোনো কিছু আমার নজরে এলে অবশ্যই সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ সচিব ফারহানা মমতাজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেন বলেন, মানদণ্ড সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী কিংবা সচিব মহোদয়ের দপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। নির্দেশনা পেলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

ডিপিডিসির মতো একটি সংবেদনশীল ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানে যদি যোগ্য নেতৃত্বের অভাব থাকে এবং তা যদি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চারণভূমিতে পরিণত হয়, তবে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ গ্রাহক ও জাতীয় গ্রিডের ওপর পড়বে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনতিবিলম্বে বিতর্কিত নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় স্থায়ী কর্মকর্তাদের পদায়ন না করলে ডিপিডিসির প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। কেবল বাস্তবমুখী নীতিমালা এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনই পারে ডিপিডিসিকে এই ‘জগাখিচুড়ি’ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে।






জাতীয় এর আরও খবর: