শিরোনাম

দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবচ ডিপিডিসির সার্কুলার! : নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট

 প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবচ ডিপিডিসির সার্কুলার!  : নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট

সংবাদকর্মীদের মুখ বন্ধ রাখতে অদ্ভুত সার্কুলার

শুধু প্রশাসনিক নয়, সাইবার প্রোপাগান্ডায়ও লিপ্ত

রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে মরিয়া বিশেষ চক্র

ফ্যাসিস্ট আমলে নির্যাতিতরা আজও কোণঠাসা


হাসান মাহমুদ রিপন:

দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম মেরুদণ্ড ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) বর্তমানে এক চরম প্রশাসনিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার আবর্তে নিমজ্জিত। প্রতিষ্ঠানটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা একটি অসাধু চক্র ডিপিডিসিকে কার্যত কুক্ষীগত করে ফেলেছে। নিজেদের রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে মরিয়া এই বিশেষ চক্রটি এখন এতটাই বেপরোয়া যে, তাদের অনিয়ম আড়াল করতে এবং সংবাদকর্মীদের মুখ বন্ধ রাখতে খোদ প্রতিষ্ঠানটি থেকেই জারি করা হয়েছে বিতর্কিত এক সার্কুলার। গত ২০ এপ্রিল জারি করা এই নির্দেশনাকে সচেতন মহল ‘দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবচ’ এবং ‘বাকস্বাধীনতা হরণের অপচেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন।

নেপথ্যের কুশীলব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিপিডিসি’র অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা এই বিশেষ চক্রটি বহুমুখী পন্থায় তাদের আধিপত্য বিস্তার করছে। শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণই নয়, তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাইবার প্রোপাগান্ডায়ও লিপ্ত। ‘পাওয়ার সেক্টর’ বিষয়ক ফেসবুক পেজ খুলে তারা অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা সংবাদ কর্মীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই চক্রের রোষানল থেকে বাদ যাননি খোদ বিদ্যুৎ সচিবও; তার বিরুদ্ধেও অত্যন্ত উসকানিমূলক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে ওই পেজগুলোতে।

অভিযোগ উঠেছে, এই অপপ্রচারের নেপথ্যে ডিপিডিসির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং একটি শ্রমিক সংগঠনের কথিত দুই নেতার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া কতিপয় দুর্নীতিবাজ নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এই মিশনে অর্থ ও বুদ্ধি দিয়ে সহায়তা করছেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য— নিজেদের রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষা করা এবং দুর্নীতির খবর যারা প্রকাশ করছে, সেই সংবাদকর্মীদের সামাজিকভাবে হেনস্তা করা।

সচেতন মহলের দাবি,  ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাইবার প্রোপাগান্ডায়ও লিপ্ত একাট্টা হওয়া এই দুর্নীতিবাজদের চক্রের দ্রুত মূল উৎপাটন করা না গেলে সংস্থাটিতে সার্বিকভাবে ধ্বস ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।

সার্কুলারের নামে ‘রক্ষাকবচ’

ডিপিডিসিতে যখন শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে দুর্নীতিবাজদের ছেঁটে ফেলার দাবি প্রবল হচ্ছিল, ঠিক তখনই গত ২০ এপ্রিল সংস্থাটির এইচআর বিভাগ থেকে একটি অদ্ভুত সার্কুলার জারি করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে:

‘ডিপিডিসির কোনো এমপ্লয়ী (কর্মকর্তা-কর্মচারী) চাকরীবিধির ৭.২ (বি) রোমান তিন এর অথবা রাষ্ট্রীয় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অযাচিত তথ্য মিডিয়ায় দেয়ার ব্যাপারে জড়িত হলে সংশ্লিষ্ট এমপ্লয়ীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ও রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁস বন্ধ করার একটি অপকৌশল। এই নির্দেশনার ফলে সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ডিপিডিসিতে কতিপয় দুর্নীতিবাজ রয়েছেন এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষ যেখানে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে তারা এমন সার্কুলার জারি করে নিজেদের আরও বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।’



ফ্যাসিস্ট প্রেতাত্মা ও বৈষম্যের অভিযোগ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক প্রকৌশলী অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ডিপিডিসিতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যারা নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তারা আজও কোণঠাসা। পক্ষান্তরে, ওই আমলের সুবিধাভোগী এবং বিতর্কিত কর্মকর্তারা এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ প্রকৌশলীদের গুরুত্বহীন স্থানে পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে, আর বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি সিন্ডিকেট ডিপিডিসিকে নিয়ন্ত্রণের নীল নকশা বাস্তবায়ন করছে।

এ ব্যাপারে ডিপিডিসি’র নির্বাহী পরিচালক এডমিন অ্যান্ড এইচ আর (অ.দা.) মোহাম্মদ হায়দার আলীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের একাধিকবার চেষ্টা করা হলে তিনি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।

নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা ও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান

বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুৎসা রটানো হলেও ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দৃশ্যমান তেমন কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ সাংবাদিকদের কলম থামাতে এবং দুর্নীতির তথ্য গোপন করতে তড়িঘড়ি করে সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে, সিন্ডিকেটটি ডিপিডিসির প্রশাসনিক কাঠামোর চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘জনভোগান্তি বাড়াবে এমন কোনো ব্যক্তি অথবা সিন্ডিকেটকে বর্তমান সরকার বরদাশত করবে না। ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ হাসিলে কোনো গোষ্ঠী যদি প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করে, তবে তাদের কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এই সিন্ডিকেটকে আমরা সমূলে নির্মূল করব।’

ডিপিডিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এম.ডি) নূর আহ্মদের সাথে মোবাইল ফোনে রোববার সকাল ১০ ঘটিকার দিকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। 

ডিপিডিসির মতো একটি সংবেদনশীল ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব এবং বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর একাধিপত্য সরাসরি জাতীয় গ্রিড ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনতিবিলম্বে বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ করে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন করা না হলে ডিপিডিসির প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। কেবল বাস্তবমুখী স্বচ্ছ নীতিমালা এবং একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনই পারে ডিপিডিসিকে এই ‘জগাখিচুড়ি’ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে।


জাতীয় এর আরও খবর: