শিরোনাম

বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানিতে ধোয়া হচ্ছে বিষ: রাজধানীর সবজি বাজারে ‘মরণফাঁদ’

 প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৬ অপরাহ্ন   |   মহানগর

বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানিতে ধোয়া হচ্ছে বিষ: রাজধানীর সবজি বাজারে ‘মরণফাঁদ’

বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানিতে ধোয়া হচ্ছে সবজি : রাজধানীর সবজি বাজারে ‘মরণফাঁদ’

মাহফুজার রহমান :


​রাজধানীর প্রাণ বলে পরিচিত বুড়িগঙ্গা নদী এখন কেবল নামেই নদী। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন আর প্লাস্টিক বর্জ্যে কুচকুচে কালো হয়ে যাওয়া এই নদীর পানি এখন এক মরণব্যাধির উৎস। দৈনিক অর্থবীতির কাগজ  সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায় এই চরম দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতেই ধোয়া হচ্ছে বাজারের টাটকা শাকসবজি। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি এক ভয়াবহ সংকেত।

​সতেজ দেখানোর আড়ালে বিষক্রিয়া

 রাজধানীর কেরানীগঞ্জ ও সদরঘাট সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার তীরের বিভিন্ন পয়েন্টে ভোরে সবজি ব্যবসায়ীরা ভিড় জমান। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ট্রাক থেকে নামানো ধুলোবালি মাখা সবজিগুলোকে আকর্ষণীয় ও সতেজ দেখাতে ব্যবহার করা হচ্ছে নদীর এই পচা পানি। লাল শাক, পালং শাক, মুলা ও কলমি শাকের মতো পাতা জাতীয় সবজিগুলো এই পানিতে চুবিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে।

​ব্যবসায়ীরা দৈনিক অর্থনীতির কাগজের কাছে  দাবি করেন , ওয়াসার পানি বা ভালো পানি সংগ্রহ করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা হাতের কাছে থাকা নদীর পানিই ব্যবহার করছেন। তবে এই পানির ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

​বুড়িগঙ্গার পানিতে যা আছে

​পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িগঙ্গার পানিতে বর্তমানে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায়। গবেষণায় দেখা গেছে এই পানিতে রয়েছে:

​ভারী ধাতু: সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো মারাত্মক উপাদান।

​রাসায়নিক বর্জ্য: হাজারীবাগ ও আশপাশের ট্যানারি ও কলকারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল।

​ব্যাকটেরিয়া: ই-কোলাই ও সালমোনেলার মতো প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার চারণভূমি এই পানি।

​ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে জানান, "সবজি রান্নার সময় উচ্চ তাপে অনেক জীবাণু মারা গেলেও ভারী ধাতু (Heavy Metals) কখনোই দূর হয় না। এই সবজি নিয়মিত খেলে মানবদেহে নিম্নোক্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে:"

​কিডনি ও লিভার অকেজো হওয়া: পানিতে থাকা সীসা ও ক্যাডমিয়াম সরাসরি কিডনি ও লিভারের টিস্যু নষ্ট করে দেয়।

​ক্যান্সারের ঝুঁকি: দীর্ঘ সময় ধরে এই বিষাক্ত উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

​শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত: গর্ভবতী নারী ও শিশুরা এই বিষাক্ত সবজি খেলে শিশুদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

​চর্মরোগ: এই পানিতে ধোয়া সবজি কাটাকাটি করার সময় বিক্রেতা ও গৃহিণীদের হাতে দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগ হতে পারে।

​প্রশাসনের ভূমিকা ও জনদাবি

​পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, কেবল নদীর দূষণ রোধ করলেই হবে না, বাজারগুলোতে এই পানির ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। সাধারণ মানুষের দাবি, বাজারগুলোতে বিশুদ্ধ পানির কল বা হাইজিনিক জোন তৈরি করা হোক এবং যারা নদীর পানি ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

​ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ

​ততদিন পর্যন্ত ক্রেতাদের নিজেদেরই সতর্ক থাকতে হবে:

​বাজার থেকে কেনা সবজি অন্তত ১৫-২০ মিনিট লবণ মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।

​সবজি কাটার আগে ও পরে প্রচুর পরিমাণ পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

​রান্নার সময় ভালোভাবে সেদ্ধ করা নিশ্চিত করুন।

​সবশেষে: আপনার থালায় সাজানো সতেজ সবজিটি কি সত্যিই নিরাপদ? প্রশ্নটি এখন কোটি টাকার। প্রশাসনের তড়িৎ পদক্ষেপই পারে এই নীরব ঘাতক থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে।

মহানগর এর আরও খবর: