পটুয়াখালী মুসলিম পাড়া জামে মসজিদে মুয়াজ্জিন আয়ুব আলী খানের রাজকীয় বিদায়
মোঃ রাজু, (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালী পৌরসভার মুসলিম পাড়া জামে মসজিদে দীর্ঘ ২৫ বছরের নিষ্ঠা, সততা ও একাগ্রতার সঙ্গে খেদমত শেষে মুয়াজ্জিন আয়ুব আলী খানকে রাজকীয় বিদায় জানানো হয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) তার কর্মজীবনের শেষ জুমাকে ঘিরে মসজিদ প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ; উপস্থিত মুসল্লিদের অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
বিদায় উপলক্ষে মসজিদ কমিটি ও মুসল্লিদের পক্ষ থেকে তাকে নগদ দুই লক্ষ টাকা সম্মাননা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি জায়নামাজ, তসবিহ, মেসওয়াক, আতর, পোশাকসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা ইমাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, “একজন মুয়াজ্জিনের প্রতি এ ধরনের সম্মান ও ভালোবাসা সত্যিই বিরল। আয়ুব আলী খান তার নিষ্ঠা, সততা ও দীর্ঘদিনের খেদমতের মাধ্যমে সবার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। এটি সমাজের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।”
মসজিদ কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট গোলাম আহাদ দুলু বলেন, “তিনি শুধু একজন মুয়াজ্জিন নন, এলাকাবাসীর কাছে একজন অভিভাবকের মতো ছিলেন। তার অবদান কখনো ভোলার নয়। এমন সম্মানজনক বিদায় খুব কম মানুষের ভাগ্যে জোটে।”
মসজিদের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আয়ুব আলী খান এই মসজিদের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার হাত ধরেই মসজিদটি আজকের এই নান্দনিক রূপ লাভ করেছে।”
সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুছ আহমাদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমাদের মাঝে থেকে মসজিদে খেদমত করেছেন। বিদায়বেলায় আমরা তাকে সামান্য সম্মান জানাতে পেরে গর্বিত। আমরা চাই, দেশের প্রতিটি মসজিদেই ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানো হোক।”
শেষ জুমার নামাজে মুসল্লিদের অনুরোধে আয়ুব আলী খান শেষবারের মতো আজান দেন। আজান দিতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় উপস্থিত মুসল্লিরাও অশ্রুসিক্ত নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
বিদায়ী বক্তব্যে আয়ুব আলী খান বলেন, “আমি দীর্ঘ ২৫ বছর এই মসজিদে খেদমত করার সৌভাগ্য পেয়েছি। ২০০১ সালে যখন এখানে আসি, তখন মসজিদটি ছিল একটি ভাঙাচোরা টিনের ঘর। আজ এটি পটুয়াখালী পৌরসভার অন্যতম নান্দনিক মসজিদে পরিণত হয়েছে। এই মসজিদ ও এলাকার মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা আমৃত্যু অটুট থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে। তাদের ভালোবাসায় আমি বড় হয়েছি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন ভালোবাসা ও সম্মান নিয়ে বিদায় নিতে পারব, তা কখনো ভাবিনি। আমি সবার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।”
জানা যায়, পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের গেড়াখালী গ্রাম থেকে ২০০১ সালে এসে তিনি এই মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি এলাকাবাসীর সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন।
শেষবারের মতো তার কণ্ঠে উচ্চারিত ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে যেন কেঁপে ওঠে পুরো মুসলিম পাড়া জামে মসজিদ। উপস্থিত মুসল্লিরা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আয়ুব আলী খান আমাদের পরিবারের একজন সদস্যের মতো ছিলেন। তার অবসর জীবনে সুস্থতা ও শান্তি কামনা করি।”
অনুষ্ঠান শেষে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এই আবেগঘন বিদায়ের সমাপ্তি ঘটে।
