রাতের চেকপোস্ট অর্থ আদায়ের ফাঁদ : মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
মাহফুজার রহমান:
রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের রাতের চেকপোস্ট কার্যক্রম এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের নাম। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই চেকপোস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার আড়ালে নিয়মিতভাবে আটক, জিম্মি করে রাখা ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন গভীর রাতে চেকপোস্ট বসিয়ে ১০ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তবে এই আটক কোনো নিয়মিত গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার অংশ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আটককৃতদের থানায় নেওয়া হয় না, এমনকি গ্রেপ্তার দেখানোর কোনো নথিও তৈরি করা হয় না।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চেকপোস্টে দুটি গাড়ির একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। একটি গাড়িতে তল্লাশি ও আটক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, অন্য গাড়িতে আটক ব্যক্তিদের বসিয়ে রাখা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এ সময় আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা আনার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, পরিবারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পৌঁছানোর পরই আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। টাকা দিতে না পারলে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা, ভয়ভীতি দেখানো এবং মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—প্রতিদিন একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হলেও কাগজে-কলমে মাত্র একজনকে থানায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বাকি আটক ব্যক্তিদের নাম, সময় বা কারণ কোথাও লিপিবদ্ধ থাকে না। এতে প্রশ্ন উঠছে—বাকি আটক ব্যক্তিরা আইন অনুযায়ী কোথায় ছিলেন? কার হেফাজতে ছিলেন? এবং কোন ক্ষমতায় তাদের আটকে রাখা হয়েছিল?নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগীর স্বজন বলেন, “আমার ভাইকে রাতে ধরে নেয়। বলে সন্দেহভাজন। পরে ফোন করে বলে টাকা না দিলে মামলা দেবে। টাকা দেওয়ার পর রাস্তার পাশে ছেড়ে দেয়। থানায় যাওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাউকে আটক করার পর থানায় না নেওয়া, গ্রেপ্তার দেখানো না হওয়া এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা সরাসরি আইনের অপব্যবহার, বেআইনি আটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যদি এই অভিযোগগুলোর সঠিক তদন্ত না হয়, তাহলে এটি একটি সংঘবদ্ধ অনিয়মে পরিণত হতে পারে। তারা অবিলম্বে চেকপোস্ট কার্যক্রমের সিসিটিভি ফুটেজ, ডিউটি রোস্টার, আটকসংক্রান্ত রেজিস্টার এবং থানার গ্রেপ্তার তালিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই, রাতের এই চেকপোস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, নাকি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অঘোষিত ব্যবস্থা?
