৫ অগাস্টের পর লকডাউন থাকবে, নাকি থাকবে না জানা যাবে আজ

৫ অগাস্টের পর লকডাউন থাকবে, নাকি থাকবে না জানা যাবে আজ

কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধে এপ্রিলের পর থেকে একের পর এক লকডাউন ও বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছেন সবাই। জীবনের জন্য জীবিকা দরকার, আবার জীবিকার জন্য জীবনও থাকতে হবে। এই দুটোর সমন্বয় আমাদের করতে হয়। সরকারের সব দিকেই ব্যালেন্স করে চলতে হয়। দেশে গত বছর মার্চে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর প্রায় দেড় বছরে বর্তমানেই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। গ্রেপ্তার, জরিমানা, মামলা কোনো বিধিনিষেধেই কাজ হচ্ছে না। নানা ছুঁতোয় বাসা-বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছেন সবাই। নগরীতে গাড়ির জটও দেখা গেছে গত কয়েকদিন ধরে।
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিস্তারে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে রেকর্ডের এই সময়ে সবারই প্রশ্ন ৫ অগাস্টের পর লকডাউন থাকবে, নাকি থাকবে না? কঠোর থেকে কঠোরতম লকডাউনের পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় করোনাভাইরাস মহামারীর দেড় বছরে এখনই সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পার করছে বাংলাদেশে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে আরেক দফা বিধি-নিষিধে বাড়ানো হচ্ছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হবে। মঙ্গলবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তা চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছে সরকারি সূত্র। সভায় ১২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ১৬ জন সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশ মহাপরিদর্শক, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, আইইডিসিআর পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেবেন।

চলমান বিধি-নিষেধ শেষে নতুন করে যে বিধি-নিষেধ দেওয়া হবে তাতে সরকারি-বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে খুলবে। আর গণপরিবহন সীমিত পরিসরে চালু করা হতে পারে। রপ্তানিমুখী শিল্প-কলকারখানা চালু রাখা হবে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান লকডাউন আরও ১০ দিন বাড়ানোর সুপারিশ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম বলেন, আমরা আরও ১০ দিন বিধি-নিষেধ বাড়ানোর সুপারিশ করেছি। তিনি জানান, যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, আমরা কীভাবে এ সংক্রমণ সামাল দেবো? রোগীদের কোথায় জায়গা দেবো? সংক্রমণ যদি এভাবে বাড়তে থাকে তাহলে কি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব? অবস্থা খুবই খারাপ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব বিবেচনাতেই আমরা বিধি-নিষেধ বাড়ানোর সুপারিশ করেছি। ’

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বিভিন্ন প্রস্তাব আছে, সেগুলো বিবেচনা করে কীভাবে করলে এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেটি আমাদের মূললক্ষ্য। আমাদের কাজকর্মগুলো, যেগুলো একেবারেই অপরিহার্য, সেগুলো চালানো। সেটি কী করলে ভালো হবে, সেজন্য আরেকটু সময় আমাদের লাগবে।

ঈদের পরের লকডাউনে প্রথমে সবকিছু বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও শিল্পমালিকদের বারবার অনুরোধে সরকার ডেডলাইনের চারদিন আগে রোববার রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা খুলে দেয়। দু’দিনের জন্য চালু করা হয় গণপরিবহন। এরপর থেকে রাজধানীসহ দেশজুড়ে রাস্তাঘাটে জনসমাগম বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে সামনের দিনে ‘বিধিনিষেধ’ কেমন হবে তা নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকরা এখনও নিশ্চিত নন। ৫ অগাস্টের পর চলমান লকডাউনের কী হবে সেই সিদ্ধান্ত জানা যাবে আজ মঙ্গলবার।

লকডাউনে খেঁটে খাওয়া মানুষের ক্ষতি হচ্ছে, চলাচলে কষ্ট হচ্ছে, একারণে এই লকডাউন তুলে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. নজরুল ইসলাম। অনির্দিষ্টকালের জন্য সব কিছু বন্ধ করে দেওয়াটাও বাস্তবসম্মত না। তারপরও যেটা শুরু হয়েছে সেটা আরও কার্যকরী করে শণাক্তের হার ৫ এর নিচে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। এজন্য মানুষকে যা যা সাপোর্ট দেওয়া দরকার করতে হবে। না হলে মানুষেরও ক্ষতি হবে, অর্থনীতিরও ক্ষতি হবে। দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাব।

চলমান লকডাউন পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, “এই লকডাউন অতিদ্রুত বন্ধ করা উচিত। কারণ এটা লকডাউন না, এটা যে কী- জানি না। লকডাউন মানে কী রাস্তায় এত যানজট? এটা লকডাউন না, এটা কিচ্ছু না। এটা থাকল, কি থাকল না- এতে করোনার কিছু আসে-যায় না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আটকাতে হলে যার একটু লক্ষণ দেখা যাবে, সে এসে টেস্ট করবে। সে যদি আসতে না পারে, তাহলে তাকে উপজেলা থেকে গাড়ি গিয়ে তাকে নিয়ে এসে নমুনা নিয়ে আবার যেন বাসায় দিয়ে আসে। নমুনা পরীক্ষার ফলাফল যেন পরদিনই দিয়ে দেয়। পজিটিভ হলে তাকে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই পরিবারটিকে কোয়ারেন্টিন করতে হবে। স্থানীয় প্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আর ১০০ শতাংশ মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা এবং সংস্থাটির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মানুষ মানতে পারছে না বলে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়াটা হবে উল্টোপথে হাঁটা। বিধিনিষেধ কার্যকর করতে আমাদের কোথায় কোথায় সরকারি- সামাজিক সহায়তা লাগবে, কীভাবে আরও রিসোর্স মবিলাইজ করা যায়-সেগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করা দরকার। বিধিনিষেধ ততক্ষণ পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া দরকার, যতক্ষণ শনাক্তের হার শতকরা ৫ এর নিচে না আসে, মৃত্যুটা ৫০ এর নিচে না আসে। বিধিনিষেধ যেন মানুষ মেনে চলতে পারে তেমন সহায়ক কার্যক্রম নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড টিকা গ্রহণকারীদের প্রায় সবার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার তথ্য এসেছে। গবেষকদলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত কোভিড-১৯ টিকা গ্রহণকারী ২০৯ জনের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়েছে। এ গবেষণার স্বেচ্ছাসেবীদের অর্ধেকের বেশি আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানিসহ অন্যান্য রোগে ভুগছিলেন। যারা আগেই কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের শরীরে তুলনামূলক অ্যান্টিবডির মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে বলে জানাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক দল। তারা বলছেন, সময়ের সাথে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির পরিবর্তন এবং পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিতে নতুন অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য টিকার অ্যান্টিবডি তৈরির কার্যক্ষমতা পর্যালোচনার জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন।

Share This Post