স্মৃতিতে নেই “স্মৃতি” পরীমণির প্রথম স্বামী সৌরভ

স্মৃতিতে নেই “স্মৃতি” পরীমণির প্রথম স্বামী সৌরভ

বি এম আসাদ (যশোর ) :

“স্মৃতি এখন আর আমার ‘স্মৃতিতে’ নেই।” পরীমণির ‘প্রথম স্বামী’ যশোরের কেশবপুরের ফেরদৌস কবীর সৌরভ অনেকটা আক্ষেপ করেই বলছিলেন।

র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পরই মূলত আলোচনায় আসেন ২৬ বছর বয়সী এই ফুটবল খেলোয়াড়। এতোদিন অনেকটা নিভৃতেই ছিলেন। ফুটবল খেলা আর ছাত্ররাজনীতিই মেতে ছিলেন তিনি।

সম্প্রতি তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় বেশ খানিকটা বিব্রত এই যুবক। অনেক বলে-কয়ে তাকে কথা বলার জন্যে রাজি করানো হয়। মূলত বৃহস্পতিবার থেকেই তিনি নিজেকে খুব বেশি আড়াল করছেন মিডিয়াকর্মীদের কাছ থেকে। শর্তসাপেক্ষে তার সঙ্গে আলাপ হয় এই প্রতিনিধির।

শুক্রবার সকালে যশোরের কেশবপুর পৌরএলাকায় তার সঙ্গে বেশকিছুক্ষণ কথা হয়। তিনি মোটেও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে রাজি নন। তাছাড়া মিডিয়াকর্মীদের প্রতি তার বিরূপ ধারণাও রয়েছে।

বললেন, গেলদিন বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে উদ্ধৃত করে বেশকিছু সংবাদ প্রকাশ হয়েছে; যা আমি একবারও বলিনি। যার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন কোনও সম্পর্কই নেই, তাকে নিয়ে কেন কথা বলবো আমি- প্রশ্ন করেন তিনি।

সৌরভের সাথে স্বল্পসময়ের আলাপকালে জানা যায়, ২০১৪ সালের জুন মাসের দিকের ঘটনা। একটি জাতীয় দৈনিকের বিশেষ পাতায় স্মৃতি (পরীমণি) ও নায়ক ফেরদৌসের একটি শাড়ি ও পাঞ্জাবির বিজ্ঞপান ছাপা হয়। তিনি তখন বিজেএমসির হয়ে ফুটবল খেলেন। থাকেন ঢাকার বনশ্রীতে একটি সাবলেট বাসায়। রাতে বাড়ি ফিরে তিনি ওই বিজ্ঞাপনটি দেখেন। দেখার পর স্ত্রীকে জিগগেস করেন- এসব কী হচ্ছে!

প্রত্যুত্তরে পরীমণি জানান, তিনি মিডিয়ায় কাজ করতে চান, নায়িকা হতে চান।

এভাবে কথা চলার একপর্যায়ে সৌরভ জিগগেস করেন- তার সঙ্গে ঘর-সংসার করবে, না কি এভাবে মিডিয়ায় কাজ করবে। পরীমণি সাফ জানিয়ে দেন- তিনি মডেল তারকা হবেন, নায়িকা হবেন।

সৌরভ বলেন, ওই ঘটনার পর আমরা দু’জন পরস্পর পৃথক হয়ে যাই; কোনও উচ্চবাচ্য করিনি, তার উপরে অধিকারও ফলাইনি। ফিরে আসি কেশবপুরের বাসায়।

পরিচয়

এসএসসি পরীক্ষার পর সৌরভ তার দাদাবাড়ি পিরোজপুরের ঝালকাঠি উপজেলার মরিচবুনিয়া গ্রামে বেড়াতে যান। স্মৃতির নানাবড়ি ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ভগিরথপুরে। তাদের দুটো গ্রাম পাশাপাশি। একদিন বাজারে ফুফাতভাইদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন সৌরভ। ওইসময় বাজারে প্রথম দেখেন স্মৃতিকে। এরপর ফুফাতভাইয়ের মাধ্যমে স্মৃতির সঙ্গে পরিচয়। সে তখন দশম শ্রেণির ছাত্র।

প্রেম চলে প্রায় দু’বছর।

বিয়ে

২০১২ সালের এপ্রিল মাসের শেষদিকে সবার অলক্ষ্যে স্মৃতিকে তিনি কেশবপুরের বাসায় নিয়ে আসেন। ২৮ এপ্রিল তাদের বিয়ে হয়। স্থানীয় কাজি ইমরান হোসেন তাদের বিয়ে পড়ান।

সৌরভ বলেন, বিয়েতে আমার বাবা, মা আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত থাকলেও স্মৃতির পরিবারের কেউই ছিলেন না।

পিরোজপুরে স্মৃতি নানাবাড়িতে থাকতেন। কিন্তু তার পৈত্রিক নিবাস নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বাকা গ্রামে। সেকারণে কাবিননামায় প্রৈত্রিক বাড়ির ঠিকানা লেখা হয়।

বিয়েতে কী উপহার দিয়েছিলেন- জানতে চাইলে সৌরভ বলেন, বিয়েতে সাধারণত যেসব জিনিস দেওয়া হয়- তাইই দেওয়া হয়েছিল। বিশেষকিছু না। তাছাড়া আার বয়সও ভাবুন। সেইসময় কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছি।

তিনি বলেন, বিয়ের পর স্মৃতি নানু এসেছিলেন। তিনি এই বিয়ে মেনে নেন। কেননা স্মৃতি তখনও পড়াশুনা করছে, আমিও পড়াশুনার পাশাপাশি ফুটবল খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কেশবপুরের বাসায় তাকে রেখে আমি ঢাকায় চলে যাই। তখন আমার ঢাকার একটি টিম থেকে ডাক এসেছে।

ঘরসংসার

মাসতিনেক পর স্মৃতিকে নিয়ে বনশ্রীর একটি বাসায় সাবলেট নিয়ে থাকতাম। ঘর-সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র আম্মু-আব্বুই কিনে দিয়েছিলেন। আমি ভর্তি হই ইউল্যাব-এ , বিবিএতে। আর স্মৃতিকে মীরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে; সে তখন এইসএসসি প্রথমবর্ষে।

তখন সৌরভ একেবারে তরুণ, স্মৃতিও তরুণী। সৌরভের নেশা-পেশা ফুটবল আর স্মৃতি তখন বিভোর মিডিয়াজগতের তারকা হওয়ার।

স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুন করা হয়নি কোথাও জানিয়ে তিনি বলেন, আসলে এসব কথা মনেও পড়েনি তখন। তবে, স্মৃতিকে সাথে নিয়ে কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে মহাকবির বাড়িতে এবং আশেপাশে ঘুরেছি।

মিডিয়া জগতে প্রবেশ

স্মৃতির সঙ্গে মডেল তারকা পল্লবের আগ থেকে পরিচয় ছিল। স্মৃতির বাবা একসময় সাভারে থাকতেন। পল্লব সম্ভবত উনার বন্ধু ছিলেন। তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন পরীমণি। আমার সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার আগে থেকেই তাদের পরিচয় বলে পরে জানতে পারি।

সৌরভ বলেন, পল্লব ভাইয়ের সঙ্গে স্মৃতি আমার পরিচয় করিয়ে দেয়। তার বাসায়ও গেছি কয়েকবার। কীভাবে যে স্মৃতি পরীমণি হয়ে গেছিল, তা বলতে পারবো না। তবে, প্রথম যেদিন পত্রিকায় তার ছবি ও বিজ্ঞপন দেখেছিলাম, সেদিনই সম্ভবত তার নাম পরীমণি হিসেবে ছাপা হয়েছিল। আমি ঠিক বলতে পারবো না।

‘পল্লব ভাইয়ের’ মাধ্যমে স্মৃতির মডেলিংজগতে প্রবেশ বলে আমি জানি।

পরীমণির একাধিক বিয়ে

আপনার সঙ্গে বিয়ের আগে পরীমণির কোনও বিয়ে হয়েছিল কি না বা পরে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার জানামতে আমিই তার প্রথম স্বামী। ইদানিং না কি কয়েকটি পত্রিকায় এসেছে আগেও বিয়ে হয়েছিল তার। কিন্তু আমাদের যখন প্রেমজসম্পর্ক, তখন সে কেবল ক্লাস টেনের ছাত্রী!

পরে আরও দুটি বিয়ে হয়েছে বলে শুনেছি। একজন একটি এফএম ব্যান্ড রেডিওর পরিচালক অপরজন সিনেমার পরিচালক- আমি তাদের নাম জানি না; ঘটনার সত্যতা সম্পর্কেও ধারণা নেই।

২০১৪ সালের পর থেকে স্মৃতির সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ ছিল না। ২০১৬ সালে একবার সে ফোন করেছিল। তখন তার নাম পত্র-পত্রিকায় বেশ প্রচার হয়। আমার কোনও এক বন্ধু আমাদের বিয়ের সময়কালে স্মৃতি আর আমার দু’একটা ছবি পোস্ট করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার কারণ জানতে এবং এগুলো যেন পোস্ট না করে- সেইকথা বলার জন্যে মূলত তার ফোন। সেই শেষ কথা আমার সঙ্গে।

আপনার সঙ্গে তার তালাক হয়নি, তারপরও তিনি একাধিক বিয়ে করেছেন- আপনি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখেন- ২০১৪ সালের পর থেকে আমাদের দুজনের পথ কিন্তু আলাদা হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে আমার আর কোনও ভাবনা ছিল না; তাছাড়া সেও আমাদের সম্পর্ককে অস্বীকার করেছে- আমি আসলে এইসব বিষয় নিয়ে আর কখনও ভাবিনি। তাকে নিয়ে পুনর্বার সংসার করার ইচ্ছেও আমার নেই; আমি নতুনভাবে সংসার করতে চাই।

আমরা দুই ভাই; বড়ভাই এখনও বিয়ে করেননি। তার খুব শিগগির বিয়ে হবে। আর আমি যে বয়সে বিয়ে করেছি, সেটি বলতে পারেন তারুণ্যের প্রথম ভুল। আমি সেই ঘটনাকে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবেই দেখি।

সৌরভ বিয়ে এবং ছাড়াছাড়ির এই বিষয়ে আসলে গভীরভাবে তেমন কিছু ভাবেননি দাবি করছেন। তার বাবা একজন পুলিশ াফিসার ছিলেন, মা কেশবপুর পৌরসভার একজন সাবেক কাউন্সিলর।

তিনি জানান, স্মৃতির সঙ্গে যখন আমার টানাপড়েন, সেইসময় খবর পাই- বাবা স্ট্রোক করেছেন। প্রায় দেড়মাস যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেইসময় ঢাকার একটি ফুটবল টিম থেকে খবরও এসেছিল; আমি সেখানে যেতে পারিনি। কেননা বাড়িতে মা ছাড়া কেউই ছিলেন না। তখন আর স্মৃতিকে নিয়ে ভাববার কোনও সময়ই ছিল না।

২০১৯ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর আর ঢাকায় যাওয়া হয় না। আমার টিমমেট অনেকে এখন জাতীয় দলে খেলছেন, লিগে খেলছেন- আমি যশোরের কেশবপুরে রয়েছি। এখঅনেই এখন নতুন করে খেলা ও রাজনীতি নিয়ে থাকতে চাই।

আজকের এই পরিস্থিতির একটা মূল্যায়ন করতে বললে কী বলবেন, জানতে চাইলে সৌরভ বলেন, নিায়িকা পরীমণি যদি অন্যায় করেন, তবে দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। যেহেতু তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই, সেকারণে এই বিষয়ে আমার কোনও সহযোগিতা করার প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি বলেন, সেইসময় যদি আমাদের ডিভোর্স হয়ে যেতো, তাহলে আজকে আমার এই পরিস্থিতিতে পড়তো হতো না। আমি খুবই বিব্রত আপনারা আমাকে আজ দুইদিন খুবই প্রশ্ন করছেন।

Share This Post