সমন্বয়হীনতায় চরম বিপাকে চাকরিপ্রার্থীরা : একই দিনে ১৪ চাকরির পরীক্ষা

সমন্বয়হীনতায় চরম বিপাকে চাকরিপ্রার্থীরা : একই দিনে ১৪ চাকরির পরীক্ষা

চাকরি প্রার্থীরা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন। একই দিনে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান এই পরীক্ষার আয়োজন করায় চাকরিপ্রত্যাশীরা এসব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না। এতে তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। চাকরি প্রার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বলছেন, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এতে প্রার্থীর অর্থ ও শ্রম উভয়ই নষ্ট হচ্ছে।
চলমান করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। করোনার প্রকোপ কমার সঙ্গে সঙ্গে আবারও গতি এসেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু গতি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে চাকরি প্রার্থীদের কাছে। এক প্রার্থী একাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আবেদন করলেও একই দিনে একাধিক পরীক্ষা আয়োজন করায় মাত্র একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে চাকরিপ্রত্যাশীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। একই দিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা থাকায় অংশ নিতে পারছেন না তারা। প্রার্থীর অভিভাবকরা মনে করেন, যদি কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করত তাহলে এই সমস্যায় পড়তে হতো না।

রেওয়াজ অনুযায়ী, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার ও শনিবার চাকরির পরীক্ষাগুলো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই দুই দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাস-পরীক্ষা থাকে না। কিন্তু একই দিন অনেকগুলো নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ায় প্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়বেন কি না, সে বিষয়টি ভাবে না কর্তৃপক্ষ। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে প্রার্থীদের।
শুক্রবার একই দিনে মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠানের চাকরির পরীক্ষা আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি পরীক্ষা পড়েছে একই সময়ে। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২১টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করেছিল।

আজিজুল ইসলাম নামে এক চাকরি প্রার্থী জানান, গতকাল শুক্রবার আমার একসঙ্গে তিনটি পরীক্ষা পড়েছে। আমাদের একটি চাকরির আবেদনে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু এক দিনেই একাধিক পরীক্ষা পড়ে যাওয়ায় একটার বেশি পরীক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না। পরীক্ষা দিতে না পারায় চাকরির সুযোগও কমে যাচ্ছে। এতে অনেক টাকাও গচ্চা যাচ্ছে।
রফিকুল ইসলাম নামে অপর এক প্রার্থী বলেন, আমি ১৫টি প্রতিষ্ঠানের চাকরির আবেদন করে বসে আছি। অথচ দিতে পারছি দুই-চারটা। গত শুক্রবারও একই অবস্থা হয়েছে। আগামী শুক্রবারও একই অবস্থা হবে। এখন কোনটা রেখে কোনটার পরীক্ষা দেব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। বিসিআইসি কলেজের সামনে চাকরিপ্রত্যাশী আসমা আক্তার বলেন, ‘করোনার সময় অনেক কষ্টে আমরা আবেদন করেছি। আর এখন এক দিনে চারটা পরীক্ষা থাকায় তিনটা পরীক্ষা দিতে পারছি না। আমাদের টাকা, সুযোগ দুটিই নষ্ট হচ্ছে।

একই দিনে একাধিক পরীক্ষা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে আরো অনেক চাকরি প্রার্থীকে। তাদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন চাকরি প্রার্থীরা।
শুক্রবার সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি), বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল), সাধারণ বীমা করপোরেশন, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড, বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডসহ ১৪টি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।
পিএসসি চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার একাধিক পরীক্ষা থাকায় আমরা নন-ক্যাডারের পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করেছি। আপাতত যত দিন চাকরির পরীক্ষা বেশি থাকবে তত দিন আমরা শুক্রবার-শনিবার পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের সমন্বয়ের জায়গা নেই। এটা যদি থাকত, তাহলে অন্তত সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোর তারিখ কেন্দ্রীয়ভাবে ঠিক করা যেত। আর এখন এক দিনে একাধিক পরীক্ষার তারিখ পড়ে যাওয়ায় চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

চাকরিপ্রত্যাশীদের এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, চাকরিপ্রার্থীদের কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে যাতে এরকম একসঙ্গে পরীক্ষাগুলো না পড়ে এবং সমন্বয় করে তারিখ ঘোষণা করা হয় সেজন্য আমরা একটি সার্কুলার দেব।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, সমন্বয়হীনতার অভাবে চাকরিপ্রার্থীরা বিপাকে পড়েছেন এতে কোনো সন্দেহ নাই। এতে মেধাবী ছেলেমেয়েরা তার কাঙ্ক্ষিত চাকরি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেজন্য আগামীতে পরিকল্পনায় থাকতে হবে যেন একটি চাকরির পরীক্ষার সঙ্গে যেন আরেকটি পরীক্ষার তারিখের সংঘাত না হয়।
তিনি বলেন, সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোতে সমন্বয় আনতে হবে। যাতে মেধাবীরা তার কাঙ্ক্ষিত সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। এতে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, একজন চাকরিপ্রার্থী একাধিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে চাকরির ফরম পূরণ করেছেন। যাতে তিনি ভালো একটা চাকরি পান সেটাই ছিল লক্ষ্য। যেহেতু আমাদের দেশে চাকরি পাওয়াটা সোনার হরিণের মতো। কিন্তু এক দিনে একাধিক সরকারি দপ্তরের চাকরির পরীক্ষা হওয়ার কারণে অনেক পরীক্ষার্থী অন্যান্য পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। এতে ঐ পরীক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এই মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির উচ্চ আদালতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত হবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। যাতে কোনো পরীক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত না হয়।

Share This Post