শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত নটরডেম কলেজ প্রাঙ্গণ

শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত নটরডেম কলেজ প্রাঙ্গণ

মো: ফেরদৌস রহমান
কত স্বপ্ন হারিয়ে গেছে, বিলীন হয়ে গেছে কত আশার প্রদীপ। তবুও ক্ষণ মনে আশার আলো প্রজ্বলিত হয়ে ওঠার আশায় দীর্ঘ অপেক্ষার পর চিরচেনা কলেজ প্রাঙ্গণে হাজারো শিক্ষার্থীদের পদচারণা। দীর্ঘ ১ বছর ৭ মাস পর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে গত রোববার ( ১২ সেপ্টেম্বর)। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার দেয়াল যেন টপকে গিয়ে প্রাণ ফিরেছে  শিক্ষালয়ে। নতুন করে নতুন আশা বাধবে কতশত শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ শিক্ষা বিরতিতে সাদা-কালো হয়ে গেছে মনে অঙ্কন করা হাজারো স্বপ্ন। এবার সময় আবার এসেছে স্বপ্ব রঙ্গিন করার। স্বপ্ন যেন অমর হয়ে পূর্ণতা লাভ করে, সেই জন্য উল্লাস দেখিয়ে মনে স্বস্তি নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাস মুখে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ ১৮ মাস পর কলেজ ইউনিফর্ম পড়ে ক্যাম্পাসে পা রাখা বাস্তব হলেও কারো কাছে একপ্রকার কল্পনা বনে গেছে। তাদের প্রাণে নবত্বের উল্লাস। মুখে আনন্দের সুর। সজীবতা তাদের করেছে কোমল। তারা বইয়ের সাথে আবারো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার সুযোগ পেয়েছে। আবারো একসাথে গল্প করা, ক্যান্টিনে বসে চা খাওয়া, সবুজে ঘেরা শ্যামল মাঠে বসে অবসর সময়ে আড্ডা দেওয়া যেন ফিরে এসেছে । পড়ালেখার ক্লান্তিতে আবারো রাত পোহাতে হবে, দেখতে হবে বুনে রাখা স্বপ্নের সীমানা, হাটতে হবে স্বপ্নের পথে। কত আশা নিয়ে ব্যস্ততায় নিজেকে আবারো বসাতে হবে বিদ্যাপাঠে।

নটরডেম কলেজ বাংলাদেশের প্রথম সারির সুপ্রাচীন ও সুবিখ্যাত কলেজের অন্যতম। দেশের সবজায়গায় মেধাবীরা যেখানে বিচরণ করে, তার অর্ধাংশ হলো নটরডেম থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থী। যোগ্যতা, মেধা আর পরিশ্রম দ্বারা অর্জন করতে হয় এই মহান বিদ্যাপীঠের সদস্যপদ। দেশের মেধাবীদের আড্ডাখানাও বলা যায় নটরডেম কলেজকে। দীর্ঘ ১৯ মাস মহামারী করোনা সংক্রমণের কারণে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিলো। সে-সময় থেকে নটরডেমে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা ছিলো কম। শিক্ষার্থী শূন্য নটরডেম কলেজ যেন পুরো সুনসান নীরবতায় দাঁড়িয়ে ছিল। সবুজ বাগানে যেন ফুলের অভাব বোধ করার মতো অবস্থা । কিন্তু গত রোববার ১২ সেপ্টেম্বর, দেশের সকল স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ায়, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছিলো আনন্দের জোয়ার। শিক্ষার্থীদের বরণ করতে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় বেশখানে। সকাল ৭টা থেকে নটরডেম কলেজের মূল ফটকে দূরত্ব সীমা চিহ্নিত স্থানে থেকে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। মাস্ক পড়ে একে একে প্রাণের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হতে থাকে নটরডেম কলেজ প্রাঙ্গণ। গেইট দিয়ে প্রবেশ করার সময় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে স্ব স্ব শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়। বিভিন্ন শিক্ষকরা নবীন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ দেখিয়ে দিচ্ছেন। কর্মচারীরা হ্যান্ড সেনিটাইজাইর দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভিতরে প্রবেশ করতে সহায়তা করছেন। নতুন রূপে কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশে যেন মৃদু হাওয়ায় শীতল করেছে শিক্ষার্থীদের দেহ-মন। শিক্ষকরা খুশি শিক্ষার্থী আগমনের জোয়ার দেখে। মুখে সকলের চাপা হাসি। ফুল দিয়ে বরণ করছে পরিবারের সদস্যদের। এভাবেই প্রাণবন্ত শহরের গলিতে ব্যস্তকোণে অবস্থিত রাজধানীর মতিঝিল এলাকার আরামবাগে নটরডেম এলাকা ছিলো শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। উল্লাস, উৎফুল্লতা ও আনন্দ নিয়ে শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা ও কর্মচারীদের পদচারণায় মুখরিত ছিলো নটরডেম প্রাঙ্গণ। বাদামি পোশাকে শিক্ষার্থীদের দুধের সরের ন্যায় নতুন রুপে দেখে খুশি শিক্ষক অভিভাবকরা।

 নটরডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার ড. হেমন্ত পিউস রোজারিও সিএসসি জানায়,  ” নটরডেম একটি বাগান, আর সেই বাগানের ফুল শিক্ষার্থীরা। ফুল ছাড়া বাগানের সৌন্দর্য দেখা যায় না। নটরডেম প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত যত সুনাম- খ্যাতি অর্জিত হয়েছে তা সবটাই সেই ফুলের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য। আমরা চাই, বারেবারে ফুটে উঠুক এই ফুলগুলো। বাস্তবিক ফুল ঝরে গেলেও, এই ফুল ফুটেই থাকে কালের পর কাল। তাই সকলের নিরাপদ আবাস্থল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সকলে সজাগ। সকলকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হবে।”

নটরডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান শাখার নবীন ছাত্র আরিফুর রহমান বলেন, ‘ অনেক স্বপ্ন ছিলো নটরডেম ক্যাম্পাসে বসে পড়ালেখা করবো। করোনার কারণে তা পারিনি। কিন্তু এখন সুযোগ পেয়ে খুবই আনন্দ লাগছে।”
দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া মানবিক  বিভাগের ছাত্র মুজাহিদুর রহমান সাজিদ জানায়,  ” আমরা তো মনে করেছি অটোপাসে বের হয়ে যাবো। কলেজে হয়তো আর ফেরা হবে না। কিন্তু আমরা আবার ফিরতে পেরে আনন্দিত। এ খুশি ভাষায় প্রকাশ করে বুঝাতে পারবো না। “
২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অটোপাসে বের হওয়া নটরডেম কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থী রাফসান আল ফাহিম বিষন্ন সুরে বলেন, ‘ প্রিয় ক্যাম্পাসে আর সেই দৃষ্টিনন্দন পোশাকে যাওয়া হবে না। কত স্বপ্ন দেখেছি নটরডেমে গিয়ে তা বলে বুঝানো যাবে না। স্বপ্নগুলো যেন পূরণ হয়, সলকের দোয়া চান তিনি। লেখাপড়ার জন্য তিনি বিদেশে যাবেন। নটরডেমের সুনাম অখ্যাত রাখবেন। ।’

এমন হাজারো শিক্ষার্থী নতুন স্বপ্ন দেখে পূরণ করে নিজের মনে গেঁথে রাখা স্বপ্নগুলো, নটরডেম প্রাঙ্গণে এসে। শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও পাঠদানে নতুন স্বপ্ন সাজাতে সহায়তা করে উদ্যমী শিক্ষার্থীদের। তাই প্রাণের ও মনের খুরাক জোগাতে ক্যাম্পাস মুখি হতে শিক্ষার্থীরা।

Share This Post