যেভাবে টাকার জোরে বিশ্বকাপের দল ‘কিনেছে’ কাতার

যেভাবে টাকার জোরে বিশ্বকাপের দল ‘কিনেছে’ কাতার


২০১০ সালের ডিসেম্বরে ফিফার কার্যনির্বাহী পরিষদ থেকে ঘোষণা এলো- ২০২২ বিশ্বকাপ হবে কাতারে। তখন নিশ্চয়ই ছোট্ট দেশটির প্রতি কোণে উৎসব শুরু হয়েছিল।

তবে শুধু স্বাগতিক হয়েই সন্তুষ্ট থাকেনি তারা। সাফল্যেও পুরো পৃথিবীকে দেখিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায় ছিল তাদের। আর এসবই হয়েছে তাদের ‘টাকার জোরে’।  

মূলত টাকাই (পড়ুন কাতারি রিয়াল) মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষুদ্র কিন্তু ধনী দেশ কাতারের সবচেয়ে বড় শক্তি। ফুটবলের জন্য অর্থের যোগান দিতে রাজি ছিল দেশটির শীর্ষ ক্ষমতাবানরাও। শুরুতেই দোহাতে অ্যাসপায়ার অ্যাকাডেমিকে ঢেলে সাজালো তারা। ২৩০টি ভিআইপি আসনসহ অ্যাকাডেমিতে সবচেয়ে বড় ইনডোর তৈরি করা হলো।  

অ্যাকাডেমির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে পাঁচটি সাইন্স ল্যাব আছে যেখানে- জৈব রসায়ন, উচ্চতা, দেহতত্ত্ব, বায়োমেকানিক্স এবং নৃতত্ত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করা হয়। অ্যাকাডেমিতে আছে কর্পোরেট স্যুট এবং দুটি হোটেল, একটি বুটিক এবং একটি বিশাল ট্রেনিং গ্রাউন্ড। সবমিলিয়ে আধুনিক ফুটবলের সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা সেখানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এবার আসা যাক, মাঠের বাইরের প্রস্তুতিতে। যেখানে অসংখ্য বিতর্ক দানা বেঁধেছে সেই শুরু থেকেই। ২০১০ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে কাতারের নাম ঘোষণার পর থেকেই পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে সারা বছর তাপমাত্রা থাকে অস্বাভাবিক অবস্থায়। যে কারণে স্বাভাবিক সময়ের বদলে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয় শীতকালে। ফলে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। বিশ্বকাপের বছরে মৌসুমের শিডিউল পুরো উল্টাপাল্টা হয়ে যায়।  

কিন্তু কাতারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে। ঘুষ দিয়ে বিশ্বকাপের আয়োজক হয়েছে দেশটি, এমন অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ফিফা কাউন্সিলের যে ২২ সদস্য সেবার ভোট দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ১০ জন নিয়ম ভঙ্গের দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছেন এবং আরও ৪ জনের বিরুদ্ধে একইরকম অভিযোগ উঠেছে।  

কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমতে জমতে হঠাৎ করে সামনে আসে মানবাধিকার পরিস্থিতি। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিক ও সমকামীদের সঙ্গে যে ধরনের ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে সরব হয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো। অবহেলায় বহু প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠতে শুরু করে। করোনাকালে এই অভিযোগ পায় নতুন মাত্রা। হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে।  এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জরিমানা না দেওয়ার ব্যাপার নিয়েও হৈচৈ পড়ে যায়। শুধু কি তাই, মদ্যপান নিষিদ্ধ থাকা, খোলামেলা পোশাক পরিধানের ব্যাপারে সতর্কতা উচ্চারণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বকাপ বয়কটের ডাকও দেয় বিভিন্ন সংস্থা। ইউরোপে তো রীতিমতো এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে।

এত অভিযোগ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি, কাতার একটি ফুটবল দলও প্রস্তুত করেছে যারা তাদের জার্সিতে বিশ্বকাপে খেলবে। এ লক্ষ্যে দল সাজানোর জন্য তাদের হাতে সময় ছিল খুবই কম। কিন্তু এত কম সময়েই তারা এমন একটি সাজিয়েছে যারা ২০১৯ এশিয়া কাপের শিরোপা ঘরে তুলেছে। প্রথমবারের মতো এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে তারা হারিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো এশিয়ান জায়ান্টদের। তবে ফুটবলের ইতিহাসে আয়োজক দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম র‍্যাংকিং কিন্তু কাতারের নয়, এই রেকর্ড এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার দখলে।  

আয়োজক দেশ হওয়ায় সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে কাতার। কিন্তু নিজেদের প্রস্তুত করতে তারা আরও কিছু সুবিধা ভোগ করেছে। এমনকি উয়েফার বাছাইপর্বেও ‘অদৃশ্য দল’ হিসেবে আয়ারল্যান্ডের গ্রুপের অংশ নিয়েছিল। গ্রুপের সব দলের বিপক্ষে খেলেছে তারা, কিন্তু পয়েন্ট টেবিলে তাদের নাম ছিল না।  

এরপর ২০১৯ কোপা আমেরিকার আসরেও অতিথি দল হিসেবে খেলতে দেখা গেছে কাতারকে। এর মাত্র ৩ মাস আগেই দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থা ‘কনমেবল’-এর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাতার এয়ারওয়েজের নাম ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ২০২১ গোল্ড কাপেও খেলেছে কাতার; যে আসরের সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠেছিল তারা। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, সেবার কনকাকাফ-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চুক্তি করে কাতার এয়ারওয়েজ।  

শুধু গত তিন বছরেই ফিফার পাঁচ অঞ্চলের চারটি প্রতিযোগিতায় খেলেছে কাতার। ২০২১ সালে ২২ ম্যাচে মাঠে নেমেছে কাতারের জাতীয় দল। কাতারি লিগের দলগুলো এই সংখ্যক ম্যাচ এক মৌসুমে খেলে থাকে। এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত- কাতার ২৫টি ম্যাচ ম্যাচ খেলেছে। অর্থাৎ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছে তারা এবং অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারি করেছে।  

এসবকিছুর মূলে আছে সেই অ্যাসপায়ার অ্যাকাডেমি। এশিয়ান কাপজয়ী স্কোয়াডের ৭০ ভাগ ফুটবলার উঠে এসেছেন এই বিলাসবহুল ও অত্যাধুনিক অ্যাকাডেমি থেকেই। এই অ্যাকাডেমির পেছনে কাতার খরচ করেছে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা)। সেই সঙ্গে আছেন স্প্যানিশ কোচ ফেলিক্স সানচেস, ফুটবলে কাতারের উত্থানে তার বড় ভূমিকা রয়েছে।  

একসময় বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ অ্যাকাডেমির কোচ হিসেবে কাজ করা সানচেসকে ২০০৬ সালে দোহায় নিয়ে আসা হয়। অ্যাসপায়ার অ্যাকাডেমিতে তিনি যখন যোগ দেন, তখন তার বয়স মাত্র ৩০ বছর। প্রায় ৭ বছর তিনি নতুন প্রজন্মের তরুণ খেলোয়াড় তৈরির পেছনে ব্যয় করেন। এরপর কাতারের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে অনূর্ধ্ব-২০, ২৩ এবং এরপর জাতীয় দলের কোচও হন সানচেস। ২০১৭ সাল থেকে এই দায়িত্বে আছেন তিনি।  

ধীরে ধীরে অ্যাসপায়ারের প্রভাব দোহার বাইরেও পড়তে শুরু করে। এই যেমন কাতারের তারকা স্ট্রাইকার আলমোয়েজ আলী। অ্যাসপায়ারে ৭ বছর কাটানোর পর তিনি বেলজিয়াম ইউপেন, অস্ট্রিয়ার লাস্ক এবং স্পেনের কালচারাল লিওনেসার হয়ে খেলেন। এর মধ্যে লাস্ক ছাড়া বাকি দুই ক্লাবের মালিকানার বেশিরভাগ শেয়ার আছে কাতারের অ্যাসপায়ার জোন ফাউন্ডেশনের হাতে। লাস্কের সঙ্গেও আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে এই ফাউন্ডেশনের। বিশ্বকাপের পর এই ফাউন্ডেশন নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করার কাজও করবে।

কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেও কীভাবে নিজেরা খেলার জন্য প্রস্তুতি নেবে তা নিয়ে বিশদ পরিকল্পনা ছিল তাদের। কারণ এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বকাপ খেলার উপযোগী দল গড়ে তোলার চাট্টিখানি কথা নয়। তাছাড়া দেশটির আবহাওয়া, জনসংখ্যা এবং ফুটবল অবকাঠামো মোটেই যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু তাদের হাতে অঢেল অর্থ আছে। এটাই ছিল তাদের খুঁটির জোর।  

গত ২০ বছর ধরে, কাতার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খেলোয়াড়দের নিজেদের ক্লাবে ডেকে এনেছে। কাতারি স্টার্স লিগে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের খেলোনো হয়। সেই সঙ্গে তাদের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তিও করা হয়, যাতে তারা কাতার জাতীয় দলের হয়ে খেলার যোগ্য হতে পারেন তারা। যেমন সেবাস্তিয়ান সোরিয়ার জন্ম উরুগুয়েতে এবং রদ্রিগো তাবাতা এবং লুইস জুনিয়র ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভুত। আবার রো-রো পর্তুগালের এবং করিম বদিয়াফ ফ্রান্সের নাগরিক ছিলেন।  

এখন অবশ্য ওই ধারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। সানজেস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কিশোর বয়সী ফুটবলারদের অ্যাসপায়ার অ্যাকাডেমিতে আনা হচ্ছে। যাতে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তারা কাতারের হয়ে খেলতে পারে। সেনেগালে একটি স্যাটেলাইট অ্যাকাডেমি খুলেছে অ্যাসপায়ার; যাদের কাজ আফ্রিকার প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে আনা। এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকাতেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তারা।  

অ্যাসপায়ারের ওয়েবসাইটে বলা আছে- তিন সপ্তাহ পরখ করে দেখার পর অ্যাকাডেমিতে সুযোগ দেওয়া হয় উঠতি ফুটবলারদের। ধীরে ধীরে তাদের তুলে আনা হয় বয়সভিত্তিক দলগুলোতে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের ঠিকানা হয় জাতীয় দল। গত আরব কাপের কাতারি স্কোয়াডের ১০ জন খেলোয়াড় ছিলেন, যাদের জন্ম কাতারের বাইরে। এর মধ্যে ঘানা, সুদান, মিশর, ফ্রান্স, বাহরাইন, ইরাক, আলজেরিয়া এবং পর্তুগালের খেলোয়াড়ও আছেন। ১৮ বছর বয়স থেকে টানা পাঁচ বছর তারা কাতারেই কাটিয়েছেন। পরের এক দশক তাদের নিয়েই ফুটবলে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে দেশটি।  

একটি দেশের হাতে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকলে অনেককিছুই সহজ হয়ে যায়, কাতার তাদের অর্থ জায়গামতোই কাজে লাগিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ডেকে এনে, যথেষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ করে, খেলোয়াড়দের যথেষ্ট পরিমাণ ম্যাচ খেলিয়ে এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ট্রেনিং সেন্টারে তাদের অনুশীলন করিয়ে খুব দ্রুত একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপযোগী দল গঠন করা সম্ভব; তা কাতার দেখিয়ে দিয়েছে।  

বর্তমানে ফিফা র‍্যাংকিংয়ে কাতারের অবস্থান ৫০তম স্থানে। আগামীকাল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে তারা মুখোমুখি হবে ৪৪তম স্থানে থাকা ইকুয়েডরের। অত্যাধুনিক আল বায়িত স্টেডিয়ামে হবে ম্যাচটি। কাতারের প্রস্তুতি কেমন হলো, তা দেখতে চোখ রাখতে হবে এই ম্যাচের দিকে।  

Share This Post