মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীই হচ্ছেন হেফাজতের আমির

মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীই হচ্ছেন হেফাজতের আমির

ঢাকা: কওমিপন্থীদের অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামে বাংলাদেশের আমির জুনাইদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পরে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে ভারপ্রাপ্ত আমির ঘোষণা করা হয়েছিল।  
রোববার (২৯ আগস্ট) সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আমির হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৯ আগস্ট হেফাজতে ইসলামের দ্বিতীয় আমির আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ওই রাতেই হাটহাজারী মাদরাসা মাঠে জানাজা শেষে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থান ‘মাগবারায়ে জামেয়ায়’ হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবরের পাশে জুনায়েদ বাবুনগরীকে দাফন করা হয়। দাফনের আগেই জানাজায় উপস্থিত দলীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন নিয়ে হেফাজতের প্রধান উপদেষ্টা ও মরহুম আমির জুনাইদ বাবুনগরীর মামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে ভারপ্রাপ্ত আমির ঘোষণা করেন মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী।
জানা গেছে, রোববার রাজধানীর খিলগাঁও আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদরাসায় হেফাজতে ইসলামের দু’টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম বৈঠকটি হবে খাস কমিটির। খাস কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন কমিটির সদস্য আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, আল্লামা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, আল্লামা হাফেজ নূরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মিযানুর রহমান চৌধুরী, আল্লামা সাজেদুর রহমান, আল্লামা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী, আল্লামা আব্দুল আউয়াল ও আল্লামা মুহিউদ্দীন রব্বানী।
জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক মুহিউদ্দীন রব্বানী রোববার সকাল ৮টার দিকে বাংলানিউজকে বলেন, আজ (রোববার) দু’টি বৈঠক আছে। প্রথমটি সকাল ১০টায় হবে খাস কমিটির বৈঠক। দুপুরের পরে হবে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক।
বৈঠকের এজেন্ডা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে আমির ঘোষণার বিষয়টি এ বৈঠকে অনুমোদন হবে। পরে তাকে আমির ঘোষণা করা হবে। এছাড়া সংগঠনের যেসব নেতাকর্মী কারাগারে আছেন, তাদের বিষয়েও আলোচনা হবে, তবে সেটি এজেন্ডায় নেই। বিবিধের মধ্যে আছে।
এর আগে বর্তমান মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীর ছেলে মাওলানা রাসেদ নূর বাংলানিউজকে বলেন, মরহুম আমির জুনাইদ বাবুনগরীর জানাজার সময় হাটহাজারী মাদরাসা মাঠে হাজার হাজার নেতাকর্মীর সমর্থনে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে আমির ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং তিনিই হেফাজতে ইসলামের আমির, এটাতো ঘোষণা হয়েই গেছে।  
সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির নির্বাচিত হন হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহম্মদ শফি। তিনি গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করার পর ১৫ নভেম্বর হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষা ভবনে হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন করে এ কমিটিতে হেফাজতের আমির হিসেবে নির্বাচিত করা হয় জুনাইদ বাবুনগরীকে। পরে মাত্র চার মাসের মাথায় ২৫ এপ্রিল বাবুনগরী কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন। সেদিন মধ্যরাতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলে আহ্বায়ক হন জুনাইদ বাবুনগরী। এরপর আবার ৭ জুন ঘোষিত কমিটিতেও জুনাইদ বাবুনগরী সংগঠনটির দ্বিতীয় আমির নির্বাচিত হন। প্রায় দুই মাসের ব্যবধানে গত বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) জুনাইদ বাবুনগরী ইন্তেকাল করলে তার নামাজে জানাজার আগেই হেফাজতের প্রধান উপদেষ্টা ও জুনাইদ বাবুনগরীর আপন মামা মাওলানা মুহিবউল্লা বাবুনগরীকে আমির ঘোষণা করা হয়। রোববার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে তিনিই হচ্ছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের তৃতীয় আমির।
মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর পরিচয়
মুহিব্বুল্লাহ ১৯৩৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ির দৌলতপুর ইউনিয়নের বাবুনগর গ্রামের এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হারুন বাবুনগরী বাবুনগর মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং মা উম্মে ছালমা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
তার বাবার প্রতিষ্ঠিত আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। এ মাদরাসায় আট বছর লেখাপড়া করার পর ১৯৪৯ সালে তিনি আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন। হাটহাজারী মাদরাসায় দুই বছর লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশে ১৯৫২ সালে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ চলে যান। ১৯৫৯ সালে দেওবন্দ মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস (স্নাতক) সম্পন্ন করে আরও এক বছর উচ্চতর হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
১৯৬০ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে তিনি বাবার পরিচালিত আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা করেন। ১৯৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি ওই মাদরাসার মহাপরিচালক নিযুক্ত হন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি নায়েবে আমির ছিলেন। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হন। ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পর তিনি সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি সৈয়দ ফজলুল করিমের জীবদ্দশায় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের (বর্তমান নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ফজলুল হক আমিনীর জীবদ্দশায় তিনি ইসলামী ঐক্যজোট এবং ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ এনে ২০১৮ সালে তিনি ঘোষণা দিয়ে এ সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন।
একই সঙ্গে কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশসহ সব সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন। শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর তিনি হেফাজতে ফেরেন এবং সংগঠনটির আমির হবার সম্ভাবনা থাকলেও ভাগিনা জুনায়েদ বাবুনগরীর আত্মত্যাগের মূল্যায়ন দিতে তিনি তা হতে রাজি হননি। তিনি ১৯৬০ সালে ফটিকছড়ি থানার ধর্মপুরস্থ মরিয়ম বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০২১ সালের ৪ আগস্ট তার স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তাদের তিন ছেলে ও আট মেয়ে রয়েছে।

Share This Post