মুকসুদপুরে পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা : সবুজ পাতায় দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন

মুকসুদপুরে পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা : সবুজ পাতায় দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন

মেহের মামুন (গোপালগঞ্জ) : একসময় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সোনালী আঁশ পাটের গৌরবময় অতীত হারিয়ে গেলেও নতুন করে আবার পাটের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। চলতি মৌসুমে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার পৌরসভাসহ ১৬ইউনিয়নে পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। টানা কয়েক বছর ধরে বাজার মূল্য ভাল পাওয়ায় পাট চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন স্থানীয় চাষিরা। ফলে ব্যাপক হারে এবছরেও পাট চাষ করেছেন চাষীরা।
সরজমিনে মুকসুদপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে পাটক্ষেতে চোঁখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ। সবুজ পাতার সাথে দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। যেন মাঠ জুড়ে সবুজ রঙে সাজিয়ে তুলেছে অপরূপ শোভা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত বছরের চেয়ে পাটের বাম্পার ফলন ও ভালো দামের স্বপ্ন দেখছেন এ এলাকার প্রান্তিক চাষিরা।
পৌরসভার কমলাপুর গ্রামের পাট চাষি হায়দার হোসেন বলেন, এবছর আড়াই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবছর পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাটচাষে তুলনামূলক খরচ কম, লাভ বেশি। আশা করছি এবছরও পাটের ভালো দাম পাবো। কিন্তু ভরা মৌসুমে পাটের বাজার মূল্য কম থাকে। এসময় ব্যবসায়ীরা কম দামে কিনে মজুত করে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে বিক্রি করায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হয় আমাদের মতো পাট চাষিদের।
উপজেলার উজানী গ্রামের কৃষক বাবু মোল্যা জানান, এবছর পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষবাদ করেছি। তবে আশা করছি এবার পাটের ফলন ভালই হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, এ বছর উপজেলা কৃষি বিভাগ ১০হাজার ৪শ ৫৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে পৌরসভাসহ ১৬টি ইউনিয়নে চাষীরা লক্ষ্যমাত্রার অধিক জমিতে পাট চাষ করেছেন। পরিবেশবান্ধব পাটের মোড়কসহ বিভিন্ন কাজে পাটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ও বাজার মূল্য ভাল পাওয়ায় পাট চাষের ঝুঁকছেন কৃষক। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবছরও পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা। আশা করি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারবে।
মুকসুদপুর উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষন অফিসার রুহুল কুদ্দুস আহমেদ জানান, মুকসুতপুরে গতানুগতিক পাটের ভালো ফলন হয়। তাই এলকারা কৃষকেরা পাট চাষে বেশি উৎসাহি। গত বছরের তুলনায় এ বছর পাট চাষ বেশি হয়েছে। কৃষকেরা দাম ভালো পেলে আগামীতে চাষের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে আশা করছি।
থেকে জানাগেছে, পাট থেকে তৈরি জুট জিওটেক্সটাইল বাঁধ নির্মাণ, ভূমিক্ষয় রোধ, পাহাড় ধস রোধে ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশের উন্নত পাট এখন বিশ্বের অনেক দেশে গাড়ি নির্মাণ, কম্পিউটারের বডি, উড়োজাহাজের পার্টস তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া ইনস্যুলেশন, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পেও বহির্বিশ্বে বেশ পরিচিত বাংলাদেশের পাট।
পাটকাঠি থেকে তৈরি চারকোল খুবই উচ্চমূল্যের আতশবাতি, কার্বন পেপার, ওয়াটার পিউরিফিকেশন পান্ট, ফটোকপিয়ার মেশিনের কালি, মোবাইল ফোনের ব্যাটারিসহ নানান জিনিস তৈরি করা হয়। আবার এই অ্যাকটিভেটেড চারকোল থেকে অনেক প্রসাধন সামগ্রীও তৈরি করা যায়। পরিবেশবান্ধব ও যথাযথ উপযোগীতার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা খাদ্যশস্য মোড়কীকরণে পাটের থলে ও বস্তা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫শ বিলিয়ন পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। পরিবেশ সচেতনতার জন্য এই চাহিদা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পাটের বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে।
তাই এই দিকটাতে সচেতন দৃষ্টি দেওয়া হলে তা আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। আবার পাট দিয়ে তৈরি শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, লুঙ্গি, ফতুয়া, পাঞ্জবি, শোপিস, ওয়ালমেট, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, শিকা, সুতাসহ নানান পাটজাত পণ্য যেমন আকর্ষণীয় তেমন পরিবেশবান্ধবও।
২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পন্য রপ্তানি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার যা আমাদের অর্থনীতির উজ্জ্বলদিক নির্দেশ করে। খাদ্য হিসেবে পাটের উপযোগিতাই সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কচি অবস্থায় পাটের পাতা আমাদের দেশে বেশ উপাদেয় শাক হিসেবে পরিচিত। শুকনো পাট পাতা অর্গানিক চা উৎপাদনও শুরু হয়েছে। পাট পাতার চা নামে পরিচিতি পেলেও ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এই পানীয় মানুষের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববাজারে তার পরিচিতি তুলে ধরতে পারলে তা চায়ের বিকল্প সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। আমাদের সংস্কৃতির সাথে পাট শিল্পের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। এই শিল্প আমাদের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এদেশের লক্ষ লক্ষ কৃষকের অবলম্বন এই পাটচাষ। কর্মসংস্থান, অর্থ উপার্জন, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সর্বোপরি এই দেশের ঐতিহ্য ও নিজস্বতা রক্ষায় পাট শিল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আধুনিকতার পদতলে নিষ্পেষিত যখন পুরো পৃথিবী দূষণের ফলে বিশ্ব পরিবেশ যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন পাট শিল্পের যথাযথ ব্যবহার আমাদের বাঁচাতে পারে অদূর ভবিষ্যতের অনেক ভয়াবহতা থেকে। এ শিল্প আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। এ শিল্প বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পরিচায়ক। সরকারের সজাগ দৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের এই শিল্পকে এবং ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের গৌরবান্বিত ঐতিহ্য, নিজস্বতার ধারক এই পাট শিল্পকে।

Share This Post