‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ ডেঙ্গু

‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ ডেঙ্গু

মহামারীর ভয়াবহতম বিস্তারের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ হিসেবে এসেছে ডেঙ্গু জ্বর। কোভিড রোগের চিকিৎসা নিয়ে অত্যাধিক ব্যস্ততা হাসপাতালগুলোতে এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। হাসপাতালে শয্যার ব্যবস্থা করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে রোগীদের। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলো কোভিডের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হওয়ায় সেখানে ডেঙ্গু রোগীরা সেবা নিতে পারছেন না। ফলে সেবা পেতে যেমন রোগীদের একাধিক হাসপাতাল ঘুরতে হচ্ছে, তেমনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় চাপ বেড়েছে। একে তো করোনাভাইরাস তার ওপর ডেঙ্গু- এটা হচ্ছে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। যারা করোনা ও ডেঙ্গু- দুটাতেই আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের জীবন তো আশঙ্কাজনক হয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক এক পরিচালক জানান, এক আত্মীয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যখন সুস্থ হচ্ছিলেন, তখনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ঢাকার ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নতুন নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। সুস্থ মানুষের শরীরে রক্তের প্লাটিলেট কাউন্টের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় দেড় লাখ থেকে সাড়ে ৪ চার লাখের মধ্যে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রক্তের প্লাটিলেট কমে যায়; কারও কারও রক্তক্ষরণ হয়। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর আসছে।
গত কয়েকদিন ধরেই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে বলে ঢাকার হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের কথা বলে জানা গেছে। ডেঙ্গু সন্দেহে ১০টি মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে আইইডিসিআর।
বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। সে বছর আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ালেও ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কম ছিল। গত বছর ১ হাজার ৪০৫ জন রোগী হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেন। এবছর জানুয়ারিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল চার দশকের ঘরে। জুলাইয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে এক মাসে একলাফে ২ হাজার ২৮৬ জন আক্রান্ত হন। অগাস্টের প্রথম পাঁচ দিনেই একহাজার ৪৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী পেয়েছে হাসপাতালগুলো। আর অগাস্টের প্রথম পাঁচ দিনে প্রায় দেড় হাজার ডেঙ্গু রোগী পেয়েছে হাসপাতালগুলো। এবার জুলাইয়ের পর অগাস্টেও গত বছরের তুলনায় বেশি রোগী আসায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগ বন্ধ।সরকারি হাসপাতালগুলো কোভিড ডেডিকেটেড হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিতে যেতে হচ্ছে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে। দেশের সবচেয়ে বেশি ১৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে এখানে।
হাসপাতালটির পরিচালক রশিদ উন নবী জানান, “ঢাকার অধিকাংশ হাসপাতালগুলোই এখন করোনা রোগী ভর্তি। ওইসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী হলেই আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

করোনাভাইরাসের মধ্যে ডেঙ্গু রোগী আসায় যে চাপে পড়তে হচ্ছে, সে কথা জানালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক নজরুল ইসলাম। মগবাজার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে প্রতিদিনই আউটডোরে রোগী আসছে। যাদের প্রয়োজন মনে হচ্ছে ভর্তি নেয়া হচ্ছে। সচেতন মানুষরা জ্বর হলেই দ্রুত হাসপাতালে চলে আসায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে না ।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ এইডিস মশার বিস্তার রোধে বাধাগুলো জরুরি ভিত্তিতে দূর করার উপর দিয়ে এক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের দুর্বলতাকেই সামনে আনছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, প্রথম বাধা হল, সিটি করপোরেশনে কীটতত্ত্ববিদ নেই। কীটতত্ত্ববিদ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান হবে না। শুধু মশক নিধনকর্মী নিয়ে এইডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।
এখানে রীতিমত এনটোমোলোজি টিম, ইউনিট, এনটোমোলোজির আধুনিক ল্যাবরেটরি থাকা দরকার। তাহলে এরা কোথায় বংশবিস্তার করছে- সবকিছু জানা যেত।

বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে দেশে এইডিস মশাবাহিত এই ভাইরাস জ্বরের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের বেশিরভাগই ঢাকার তুলনামূলক নিচু এলাকার বাসিন্দা বলে হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যে উঠে এসেছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহিত এইডিস মশার উপদ্রব বেড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, শনির আখড়া, কমলাপুর ও দক্ষিণখান এলাকা। প্রতিদিন অনেক ডেঙ্গু রোগী আসায় আলাদা করে ‘ডেঙ্গু কর্নার’ খুলেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমএসএইউ)।

ঢাকার নিম্নাঞ্চল ও জলাবদ্ধ এলাকা এইডিস মশা বিস্তারের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। মেয়র তাপস দাবি করেন, দুই বছর আগের তুলনায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তারা ‘সফল’। জনগণের সচেতনতা বাড়লে সে সফলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে। ডেঙ্গুর জীবানুবাহী এইডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংসে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ০১৭০৯৯০০৮৮৮ ও ০২৯৫৫৬০১৪ নম্বরে টেলিফোন করে কিংবা ওয়েবসাইটে নির্ধারিত ফরমে মশার প্রজননস্থল ও ডেঙ্গু রোগীর তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, জনসচেতনতার কারণে অন্যান্য এলাকার তুলনায় তার সিটিতে এখনও ডেঙ্গু রোগী ‘তুলনামূলক কম’। ব্যক্তিগত, সরকারি কিংবা বেসরকারি যে কোনো ভবনে এইডিস মশার লার্ভার পাওয়া গেলে জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ার করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত এইডিস মশা নির্মূলে নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন ঢাকার দুই সিটি করর্পোরেশনের মেয়র। মশার প্রজননস্থলের তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি নিজ এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে বাসা-বাড়িতে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে মশা মারা হচ্ছে বলে অগাস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসার আশা করছে দুই সিটি করপোরেশন।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে শিশুদের সামনে বিপদ হয়ে আসছে ডেঙ্গু, কোভিড-১৯ রোগের তুলনায় যেটিকে শিশুর জন্য বেশি ঝুঁকির বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে এইডিস মশাবাহিত এই ভাইরাস জ্বরে যেভাবে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে, তাতে অনেক শিশুও পাচ্ছেন তারা।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক শফি আহমেদ জানিয়েছেন, প্রতিদিনই ৭-৮ জন শিশু ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। তার হাসপাতালে ভর্তি থাকা ২৫ জন রোগীর মধ্যে দুইজন আইসিইউতে রয়েছে।

শিশুদের জন্য করোনাভাইরাসের চেয়ে ডেঙ্গুকে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে অধ্যাপক শফি বলেন, “কোভিডে বাচ্চাদের মাইল্ড সিম্পটম হয় এবং তাদের ঝুঁকিটা কম থাকে। কিন্তু ডেঙ্গুতে শিশুরা অনেক ঝুঁকিতে থাকে।”

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ছোট শিশুদের ফুলহাতা জামা-কাপড় পরানো এবং সবসময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক। বেশি মাত্রার জ্বর আসলে, মুখে অরুচি থাকলে, কিছুই খেতে না পারলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

Share This Post