বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে বাংলাদেশ

বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে বাংলাদেশ

উন্নয়নের দৌড়ে আরেক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে একটি মেট্রোরেল যেন স্বপ্নই ছিল এ দেশের মানুষের। আবার এ দেশের বুকে মেট্রোরেল হবে বা জীবদ্দশায় দেশের মাটিতে মেট্রোরেলে চড়া হবে, এমনটা ভাবেননি অনেকে। তবে এবার স্বপ্ন দৃশ্যমান। এরই মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করেছে মেট্রোরেল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যাত্রী নিয়ে চলবে এই বৈদ্যুতিক ট্রেন। এখন সারা দেশ তাকিয়ে সেদিকে। অপেক্ষা আর মাত্র ১৫ মাসের।

দেশের প্রথম এই মেট্রোরেল চালু হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। দেশের প্রথম মেট্রোরেল হচ্ছে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। বর্তমানে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে এটি মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে পর্যন্ত নির্মাণের কাজ চলছে। এটি পরে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রোরেলের এমআরপি লাইন ৬-এর বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হবে। শুরুতে উত্তরার দিয়াবাড়ি স্টেশন থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলবে এই ট্রেন। ধীরে ধীরে বাড়বে পরিধি। এভাবে কমলাপুর পর্যন্ত হবে একটি রুট। এরপর আরও পাঁচটি রুট হবে মেট্রোরেলের।

গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা স্টেশন থেকে রওনা হয়ে পল্লবী পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টায় চারটি স্টেশন ঘুরে আবার ডিপোতে ফিরেছে দেশের প্রথম মেট্রোরেল, যা ছিল মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল।

সেদিন কোনো যাত্রী পরিবহন করা হয়নি। একজন জাপানি নাগরিকের হাতে চলেছিল ট্রেনটি। তার সঙ্গে ছিলেন দেশি-বিদেশি আরও কয়েকজন।

পুরো রাজধানী সেদিন তাকিয়ে ছিল মেট্রোরেলের দিকে। ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার গতিতে চলেছিল মেট্রোরেল। ট্রেনের গতি কম থাকলেও প্রথম নিজ চোখে মেট্রোরেল দেখার আগ্রহ ছিল সবার। ফলে সেদিন সকাল থেকেই উত্তরা, মিরপুর এলাকায় মেট্রোরেল দেখার অপেক্ষায় থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো।

৩৯ বছর আগে ঢাকায় এসেছেন আবদুল আউয়াল। তখনকার ঢাকা আর এখনমার ঢাকার মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য দেখেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাস্তায় চলার গতি যে কমেছে তা আউয়ালের কথায় স্পষ্ট। তবে মেট্রোরেল দেখে আনন্দিত সত্তর বছরের বেশি বয়সী মানুষটি।

আউয়াল বলেন, ‘শেখ সাহেব (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) এই দেশটাকে নিয়া অনেক কিছু ভাবছিলেন। অনেক কিছু কইরা গেছেন। তার মেয়ে এই দেশের মানুষের জন্য কাজ করতাছেন। শেখ হাসিনার কাজ দেখলে শেখ সাহেবের কথা মনে পড়ে। মেট্রোরেলটা হইলে অনেক ভালো হয়। রাস্তার জ্যাম কমবে।’

মিরপুরের বাসিন্দা মনির হোসেনের ভাষ্য, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রোরেল চালুর পর ঢাকার যানজট কমে আসবে।

মনির বলেন, ‘এখন রোকেয়া সরণির অবস্থা কি তা সবাই জানে। মেট্রোরেল হয়ে গেলে রাস্তায় অনেক গাড়ি কমবে। যানজট কমে আসবে।’

ঢাকার রাস্তায় যানজট কমার পাশাপাশি মেট্রোরেলের সুদূরপ্রসারী সুবিধা দেখছেন উত্তরার বাসিন্দা গাউসুল আজম।

তিনি বলেন, ‘এখন যারা গাজীপুরে থাকেন, তারা গুলিস্তান, মতিঝিলে চাকরি পেলেও দূরত্বের জন্য চাকরি নিতে পারছেন না। কারণ, যাতায়াতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু মেট্রোরেল হলে ঢাকাকেন্দ্রিক অনেকের চাকরি ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকারের এই মহতি উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই।’

‘ভায়াডাক্টের ওপর প্রথম মেট্রো ট্রেন চলাচল পরীক্ষণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন’ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রোরেলের এমআরপি লাইন ৬-এর বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হবে। আগামী বছর ডিসেম্বরে তরুণ প্রজন্মের মেট্রোরেল যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করতে পারবে। তার আগে ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রী ছাড়া চলবে। মেট্রোরেল ঘুরে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, ‘আজ খুবই ভালো লাগছে। শেখ হাসিনার অবদান, মেট্রোরেল দৃশ্যমান। ছয়টি মেট্রোরেলের কাজ ২০৩০ সালে শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি। এর ধারাবাহিকতায় কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।’

৩১ জুলাই ২০২১ পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৬৮.৪৯ শতাংশ বলেও জানান তিনি।

রাজধানীর যানজট নিরসনে উড়ালসড়ক, বাসের বিশেষ লেন নির্মাণসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে। তবে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ও গণপরিবহনে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে দেখা হয় মেট্রোরেলকে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন গঠন করা হয় ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল)। ২০১৫ সালে জাপানের সহায়তায় এসটিপি সংশোধন (আরএসটিপি) করে মেট্রোরেলের রুট সংখ্যা বাড়ানো হয়।

মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে যেতে লাগবে ৩৮ মিনিট। ঘণ্টায় দুই দিক থেকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত স্টেশন হবে ১৬টি। শুরুতে ২৪টি ট্রেন দিয়ে মেট্রোরেল চালু করার কথা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে প্রাথমিকভাবে ছয়টি করে বগি থাকবে। পরে তা আটটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে।

প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, শুরুতে দিনে ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ২০৩৫ সালে যাত্রীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ লাখের বেশি।

রাজধানী উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মিরপুরের পল্লবী স্টেশন পর্যন্ত চলাচল করেছে মেট্রোরেল। পরীক্ষামূলক এই মেট্রোরেল চালানো হয়েছে। চলাচলে কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি বলে জানা গেছে।

ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার ছয়টি মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার মেট্রোরেলের কাজের অগ্রগতি হয়েছে অনেকটা। জাপানের সহায়তায় এই মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে যেতে লাগবে ৩৮ মিনিট। ঘণ্টায় দুই দিক থেকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত স্টেশন হবে ১৬টি। শুরুতে ২৪টি ট্রেন দিয়ে মেট্রোরেল চালু করার কথা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে প্রাথমিকভাবে ছয়টি করে বগি থাকবে। পরে তা আটটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, শুরুতে দিনে ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ২০৩৫ সালে যাত্রীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ লাখের বেশি।

Share This Post