বাসাভাড়ার এত বিপুলসংখ্যক বিজ্ঞাপন আগে কখনো দেখেনি এ শহরের মানুষ

বাসাভাড়ার এত বিপুলসংখ্যক বিজ্ঞাপন আগে কখনো দেখেনি এ শহরের মানুষ

শুধু নিম্নবিত্তই নয়, ঢাকায় বাড়ি ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারও। সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহজে যাতায়াতের জন্য আগে যেসব অভিজাত এলাকায় অভিভাবকরা বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় তারাই এখন কম ভাড়ায় অন্য এলাকায় বাসা নিচ্ছেন। চাকরিজীবীদের কেউ কেউ লকডাউনে হোম অফিস করায় কর্মস্থল থেকে দূরে গিয়ে অন্যত্র স্বল্পমূল্যে বাসা নিচ্ছেন। এমনকি মহামারীর কারণে নতুন তৈরি হওয়া অনেক ফ্ল্যাটও এখন ভাড়াটিয়াশূন্য।ভাড়াটিয়ারা বেশি ভাড়ার বড় বাসা ছেড়ে স্বল্প ভাড়ার ছোট বাসা খুঁজছেন। অনেক ভাড়াটিয়া ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন।এ ছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সেই বাসাগুলোও খালি পড়ে আছে।
অলিগলির রাস্তাঘাট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইনে বাড়ি ভাড়ার ওয়েবসাইটগুলোও ছেয়ে গেছে বাসা ভাড়ার বিজ্ঞাপনে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বাড়ি বাড়ি ‘টু-লেট’ বা ‘বাড়ি ভাড়া’র সাইনবোর্ড বেশি ঝুলতে দেখা যাচ্ছে।
মহামারীর কারণে ভালো নেই বাড়িওয়ালারাও। ঢাকায় যেসব বাড়ির মালিক আগে বছর বছর বাড়ি ভাড়া বাড়াতেন চলতি বছরে অনেকেই ভাড়া বৃদ্ধি করেননি। কেউ কেউ আবার ভাড়াটিয়ার অনুরোধে ভাড়া কমিয়েও দিচ্ছেন। অনেকে আছেন ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে আমি বাড়ি করেছেন। ফ্লাট ভাড়ার টাকা দিয়েই তাদের সংসার চলে। এখন ভাড়া কমিয়েও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, চাকরি জীবনের সব সঞ্চয় ও সেইসাথে ঋণ নিয়ে ৫ তলা বাড়িটি তিনি নির্মাণ করেছেন। ভাড়ার টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। সেইসাথে বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংসারের ব্যয়ের জন্যও এই ভাড়ার ওপরই তাকে নির্ভর করতে হয়। করোনার কারণে তার কয়েকজন ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার পর ফ্ল্যাট দীর্ঘ সময় খালি থাকায় অর্থনৈতিক চাপে পড়েন বলে জানান তিনি।

ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার বলেন, ঢাকা শহরের ৪০ শতাংশ ভাড়াটিয়া যাদের আয় উপার্জন কমে গেছে তারা গ্রামে চলে গেছেন। আগে যে ভাড়াটিয়া ঢাকায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনিই এখন খরচ কমাতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া নিচ্ছেন। এই ভাড়াটিয়াদের অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন আবার অনেকে বেতন ঠিকমত পাচ্ছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ তাদের জীবদ্দশায় কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে এত পাহাড়সম সমস্যার মুখোমুখি হয়নি। বহুমাত্রিকভাবে নাজেহাল হওয়ার অভিজ্ঞতা এমন অসহায় চোখে দেখেনি। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে লাখ লাখ, মরছেও দুর্বার গতিতে। এই বহুমাত্রার অভিঘাত সব দেশেই হচ্ছে। আমাদের দেশের মানুষের জীবন, ব্যবসা, চাকরিসহ আয়রোজগার সব সেক্টর ঝিমিয়ে গেছে। কোনো কোনোটা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় আছে অনেক সেক্টরের কাজকর্ম। এককথায় জীবন–জীবিকার সীমাহীন সংকট বাংলাদেশের মানুষ অতিক্রম করছে।

তাঁর মতো অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক সময়ের মতো ব্যবসা করতে পারছেন না তাঁরা। আয়রোজগার কমে যাওয়ায় নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন। আর এ পরিস্থিতি শুধু রাজধানীতে নয়, করোনার কারণে সারা দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে।

গৃহকর্মীদের দিয়ে কাজ না করাতে পেরে কষ্টে রয়েছেন গৃহকর্ত্রীরা। কাজ হারিয়ে এই সাবেক গৃহকর্মী কূল–কিনারা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পুরুষের জন্যও কঠিন সেই নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। নির্মাণকাজ করে প্রতিদিন ৩৫০ টাকা করে পাচ্ছেন এই নারীরা। চাকরি আছে বেতন নেই, এমন লোকের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁরা শহরে টিকতে না পেরে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। ১৩ ভাগ লোক, যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁরা প্রতি মাসে নিয়মিত বেতন পেতেন। তাঁরা দিনমজুর বা অনানুষ্ঠানিক কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। আর আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরি আছে কিন্তু বেতন পাচ্ছেন না, এ রকম কর্মজীবীর সংখ্যা অনেক। ২৫ ভাগের বেতন ৫০ থেকে ৩৫ ভাগ কমানো হয়েছে। অভাবনীয়ভাবে মধ্যবিত্ত ক্ষতবিক্ষত ও জর্জরিত অনেক বেশি। দীর্ঘকালের তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসারটিকে তারা তুলে দিচ্ছে পিকআপে। ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। অনেকদিন আগে যে গ্রাম ছেড়ে এসেছিলে। কথা হচ্ছে, সেখানেও তাদের সামনে অপেক্ষা অনিশ্চয়তা। একদল ফিরে গেছে বাড়ি। বাকিরা লড়ছে এখনো এই শহরে। স্রেফ টিকে থাকার সংগ্রাম।

Share This Post