পানি দুষণ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে জৈব প্রযুক্তির গুরুত্ব

পানি দুষণ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে জৈব প্রযুক্তির গুরুত্ব

মো: মাহাবুব হোসেন:

জীবের জীবনে পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । পানি ছাড়া জীবের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না । জীব বেচে থাকার সকল উপাদান পানিতে বিদ্যমান রয়েছে । আর এই জন্যই পানির অপর নাম জীবন বলা হয় । কিন্তু এই পানি বিভিন্ন ভাবে দুষিত হচ্ছে । যেমন- কলকারখানার নালা দিয়ে বেরিয়ে আসা পানি, বিভিন্ন টেক্রাটাইল ইন্ডাষ্টি থেকে কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি, বাসাবাড়ির সূস্ট ময়লা যেখানে সেখানে ফেলা ও মলমূত্র ত্যাগ করার ফলে নদী-নালা ও খাল-বিল, পুকুর ও ডোবার পানি দুষিত হয় । এছাড়া তেল ও বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক পদার্থবাহী জাহাজ ঢুবার ফলে সাগরের পানি দুষিত হয় । পানি দুষণের ফলে ব্যাকটেরিয়া,ক্ষুদ্র্র জীব, কেচো, সাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন উপকারী প্রাণী,মাছ ও জলজ উদ্ভিদের মূত্যু ও মানুষের বিভিন্ন ধরণের রোগ ( কলেনা, টাইফেড, ডিসেন্ট্রি, চর্ম) ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয় । বিজ্ঞানীদের ভাষায়, প্রায় আশি শতাংশ রোগ পানি দুষণের ফলে হয়ে থাকে । পানি দুষণের হাত থেকে বাচার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরণের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্টীয় ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করি । এছাড়া বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে পানি দুষণের পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করি । আর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের পাশাপাশি বর্তমানে জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় । জৈব প্রযুক্তি হল এমন একটি প্রযুক্তি যে প্রযুক্তির সাহায্যে কোন অণুজীব বা তার অংশ বিশেষ ব্যবহার করে নতুন কোন বৈশিষ্টসম্পন্ন জীব এর উদ্ভাবন বা উপজাত দব্য প্রস্তুত করা হয় । যেমন- জৈব প্রযুক্তির সাহায্যে সুপার ফাংশনাল ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে সমুদ্রে ভাসমান তেল অপসারণ করা যায়, যা সম্পুর্ণ রাসায়নিক পদার্থ মুক্ত । উক্ত সুপার ফাংশনাল ব্যাকটেরিয়া তেল কে শোষণ করে সাগরের পানি দুষণ মুক্ত রাখে । আবার বিভিন্ন ধরণের অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক,ভাইরাস) ব্যবহার করে পুকুর, নদীনালা ও খালবিলের বর্জ্য বা আর্বজনা কে পচনশীল করার মাধ্যমে দ্রুত জৈব উপাদানে রুপান্তর করা যায়,যা কেবলই অণুজীব জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে । অণুজীব জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কম খরচে ও দ্রুত উপায়ে এসব পুকুর, নদীনালা ও খালবিলের দুষিত পানি জীবাণুমুক্ত করা যায় ।
বর্তমাানে পানি দুষণের সবচেয়ে বড় উৎস হল কলকারখানা ও ইন্ডাষ্টি থেকে দুষিত পানি ইটিপির মাধ্যমে পরিশোধন না করে ভূপৃষ্টের ডোবা, খাল ও নদীনালায় ছেড়ে দেওয়া । এসব দুষিত পানি জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে সেখানে বসবাসরত সকল জীব ও মাছের বেচে থাকার জন্য হুমকি হয়ে দাড়ায় । তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইটিপির দুষিত পানি কে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়াকনণ করা হয় । সেটা কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে পারে । রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় । এছাড়া জৈবনিক প্রক্রিয়ায় দুষিত পানি বিশুদ্ব জন্য বিভিন্ন ধরণের মাইক্রোবস বা অণুজীব যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কচুরিপানা ব্যবহার করা হয়। বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়ায় ট্রিটমেন্ট করলে কোন ধরণের রাসায়নিক পদাথ ব্যবহার করতে হয় না । রাসায়নিক পদাথ ব্যবহার ছাড়াই পানি বিশুদ্ব করা যায়। যেমন- ব্যাকটেরিয়া পানি থেকে জীবণিু শোষণ করে পানিকে বিশুদ্ব করতে পারে ,যেখানে কোন ধরণের রাসায়নিক পদাথ ব্যবহার করতে হয় না । এছাড়া টেনারি শিল্প থেকে বেরিয়ে আসা দুষিত পানির সাথে বিভিন্ন ধরণের হেভী মেটাল বা ভারী ধাতু যেমন- ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, লেড , আর্সেনিক, কপার ও ম্যাঙ্গানিজ বিদ্যমান থাকে । এগুলো জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর করার জন্য ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয় ইড়ঃৎুড়পড়পপঁং ংঢ়. নামক এক ধরণের সুপারফিশিয়াল ব্যাকটেরিয়া । যেটি জৈব জীবাণু রোধক হিসাবে কাজ করে। এটি বর্জ্র পানিতে বিদ্যমান থাকা বিষাক্ত ভারী ধাতু যেমন- ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, লেড , আর্সেনিক, কপার ও ম্যাঙ্গানিজ দূর করতে পারে । দুষিত পানি থেকে ভারী ধাতু দূর করার মাধ্যমে পরিবেশের সুস্ত ,সবুজ ও দীর্ঘস্হায়ী উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করবে । এছাড়া মাইক্রোঅ্যালগি ও জৈব জীবাণু রোধক হিসাবে কাজ করে।
পানি পরিশোধনের জন্য জৈব প্রযুক্তির আরেকটি বিশেষ প্রযুক্তির নাম হল প্লান্ট বায়োটেকনোলজি। প্লান্ট বায়োটেকনোলজি এক ধরণের প্রযুক্তি যা বিভিন্ন উদ্ভিদকে ব্যবহার করে দুষিত পানিকে পরিশোধন করা হয়। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, ’পিথোফোরা’ নামক শ্যাওলা যা দিয়ে দুষিত ময়লা যুক্ত পানিকে পরিশোধন করে নিশুদ্ব করা যায়। এর দ্বারা পানিতে বিদ্যমান থাকা বিভিন্ন ধরণের উপাদান যেমন- ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি ক্ষতিকর অণুজীব পানি থেকে দূর করা সম্ভব । ’পিথোফোরা’দিয়ে পানিকে প্রায় শতভাগ জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব এবং পানিতে বিদ্যমান থাকা ২৭ দশমিক ২৮ ন্যানোমিটারের ক্ষুদ্র ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া পরিশোধন করা যায় ।এছাড়া অনেক সময় নদী-নালা ও খাল-বিল, পুকুর ও ডোবা, লেক ও সমুদ্রের পুিনতে বিভিন্ন রকমের তৈলাক্ত পদার্থ মিশে থাকতে দেখা যায় এবং পুিনতে বিদ্যমান থাকা এসব রাসায়নিক কারখানার নানা রকমের তৈলাক্ত পানি পরিশোধনের জন্য প্লান্ট বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করতে পারি । এক্ষেত্রে ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করা যেতে পারে । ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ তৈলাক্ত পদার্থ পরিশোষণে ব্যবহৃত হয় । ।এদেরকে পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায় । ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ জলের নিকটে জন্মাতে ও দ্রুত বৃদ্বি পেতে দেখা যায় । অনেক সময় জলের উপর ছড়িয়ে পড়ে এরং শিকড় দিয়ে তৈলাক্ত পদাথ শোষণ করে । ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করলে পরিশোধন খরচ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার চেয়ে কম হবে এবং পরিবেশের কোন রুপ ক্ষতি ছাড়াই পরিশোধন করা সম্ভব হবে ।
পানি দুষণ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে বিভিন্ন ধরণের সচেতন মূলক কর্মকান্ড আয়োজন করার পাশাপাশি জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য জনগণ কে উৎসাহ প্রদান করতে হবে । জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি দুষণ কমাতে পারলে পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন মোকাবিলা সম্ভব হবে ।

(মো: মাহাবুব হোসেন
শিক্ষার্থী
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইন্জিয়ারিং
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়)

Share This Post