পরচুলা তৈরি করে স্বাবলম্বী বেকার নারীরা : এসএমই খাতের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা ই-কমার্স

পরচুলা তৈরি করে স্বাবলম্বী বেকার নারীরা : এসএমই খাতের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা ই-কমার্স

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামে কয়েক মাস আগে চালু হওয়া মেসার্স সায়মা হেয়ার এন্টারপ্রাইজ উইকড কারখানায় গিয়ে দেখা মেলে প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী, দরিদ্র পরিবারের গৃহিণী, স্বামী পরিত্যক্তা, শিক্ষার্থীসহ ৮৫ জন নারী হেয়ার ক্যাপ বানানোর কাজ করছেন।বিদেশে টাক মাথার জন্য ব্যবহার করা হয় এসব পরচুলা। কারখানায় উৎপাদিত হেয়ারক্যাপ চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।পরচুলা বা ‘হেয়ার ক্যাপ’ তৈরি কারখানায় কাজ করে এক জন নারী মাসে আয় করছেন ৮-১০ হাজার টাকা। স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন অনেক অসহায় নারী। এ কারখানাগুলোর মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অসহায় ও দরিদ্র নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
মাত্র সাত দিন প্রশিক্ষণ নিয়েই একজন নারী নিয়মিত শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করতে পারছেন। একজন নারী শ্রমিক সপ্তাহে দুই-তিনটি করে হেয়ার ক্যাপ তৈরি করছেন। প্রতিটি হেয়ার ক্যাপ তৈরিতে মজুরি মিলছে সাইজ অনুযায়ী ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এর মধ্যে উপজেলাতে ১০টি কারখানা গড়ে উঠেছে। এতে প্রায় ২ হাজার নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। হেয়ার ক্যাপ কারখানাগুলোতে যেমন লাভবান হচ্ছেন উদ্যোক্তারা, তেমনি লাভবান হচ্ছে সমাজের অবহেলিত নারীরা। এ ধরনের কারখানা আরও বৃদ্ধি করা হলে এলাকার নারীদের সার্বিক উন্নয়ন হবে।

দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পরিধি বাড়ছে। নিজে ও অন্যকে স্বাবলম্বী করতে এসএমই খাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছেন উদ্যোক্তারা। গ্রামে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ না করা গৃহিণী থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিত বেকার যুবক সবাই ব্যবসায়িক নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন, যার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান বাড়ছে এসএমই খাতের।

দেশের মোট জিডিপির ২৫ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে। শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮৬ শতাংশই এ খাতে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২০-২৫ শতাংশ। বর্তমানে দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে। এমনকি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখে যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। কারণ অনেক উদ্যোক্তা তাদের পুরো ব্যবসায়িক কার্যক্রম অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে কাজ করছে সরকার। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এসএমই নীতি অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশের এসএমই খাতের বিকাশের এ ধারায় বাদ সাধে করোনাভাইরাস। বৈশ্বিক এ মহামারী নতুন করে এ খাতকে হুমকির মুখে ফেলেছে। করোনা উদ্ভূত বাস্তবতায় মুখ থুবড়ে পড়ার সম্মুখীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। বৈশ্বিক এ মহামারীতে মানুষের অভ্যাসগত কিছু পরিবর্তন এসেছে। ফলে সবাই অনলাইন ক্রয়-বিক্রয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। এসএমই খাতও এ পরিবর্তিত অভ্যাসকে পুঁজি করে এগিয়ে যেতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসায় জড়িতদের উচিত হবে নতুন বাস্তবতায় এ ধরনের কর্মসূচিতে সংযুক্ত হওয়া। নতুন সম্ভাবনা অন্বেষণ করা। তাহলে দেশের এসএমই খাত আরো ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।প্রথমত এসএমই খাতের জন্য একটি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। যেন সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা উপকৃত হতে পারেন। এছাড়া এ খাতের উদ্যোক্তাদের উচিত হবে বিভিন্ন ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসের সঙ্গে অংশীদারিত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়া। কারণ ই-কমার্স এসএমই খাতকে প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বিআইডিএস প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, করোনার বৈশ্বিক মহামারীর কারণে এ খাতে গত বছরের শুধু দুই মাসে ক্ষতি হয়েছে ৯২ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় এসএমই খাতে কীভাবে আবার গ্রাহক ও উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়, সেটি নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন বিক্রেতাদের অনুপ্রাণিত করতে উদ্যোক্তাদের বিশেষ কিছু সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে দারাজ দ্বিতীয়বারের মতো চলতি বছরও এ কার্যক্রম শুরু করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় উদ্যোক্তারা শূন্য শতাংশ কমিশন, সাপ্তাহিক পেমেন্ট, সাইন-আপের সময় বিনা মূল্যে প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল প্রদান ও ২৪ ঘণ্টার গ্যারান্টিসহ ভেরিফিকেশনের মতো সুবিধা পাবেন। মহামারীকালে এমন উদ্যোগ এসএমই খাতের উন্নয়নে আরো ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

Share This Post