দেশের সব রেললাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার

দেশের সব রেললাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার

দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে প্রয়োজনীয় রেল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে চায় সরকার। প্রতিবেশী মিয়ানমার, ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুরসহ আরও অনেক দেশের সঙ্গে একে যুক্ত করে বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির আলোচনা চলমান রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রকল্পপ্রস্তুতিমূলক সুবিধার জন্য কারিগরি সহায়তা’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দোহাজারী পর্যন্ত রেললাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করা হবে, যাতে ব্রডগেজ এবং মিটারগেজ দুই ধরনের ট্রেনই চলতে পারবে।এই রেললাইন প্রথমে রাজধানী ঢাকাকে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরকে সরাসরি সংযুক্ত করবে। এরপর রামুর হয়ে ঘুমধুম দিয়ে মিয়ানমার, ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুরসহ আরও অনেক দেশের সঙ্গে একে যুক্ত করে বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনার আওতায় মহেশখালী ও মাতারবাড়ির প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে রেল ট্র্যাক স্থাপন করা হবে। এছাড়াও এতে গাড়ি, ওয়াগন চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ সুবিধা, বিজি রোলিং এবং স্টকের জন্য ডিপোর পাশাপাশি রেলওয়ে পরিষেবার জন্য বেশ কয়েকটি কার্যালয়ও নির্মাণ করা হবে।
এছাড়া দেশের সব রেললাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রথমে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বর্তমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী চার থেকে পাঁচটা প্রকল্প নিয়ে একটি আম্ব্রেলা প্রজেক্ট গ্রহণ করছে সরকার। চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত এখন মিটারগেজের সিঙ্গেল লাইন আছে, এটাকে ডুয়েল লাইন ও ব্রডগেজ করার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১৩৫ কিলোমিটার রেললাইন বর্তমানে মিটারগেজে আছে, এটাকে ডুয়েলগেজের সঙ্গে ব্রডগেজ করার জন্য আলাদা একটি প্রকল্প রয়েছে। টঙ্গী থেকে আখাউড়া, টঙ্গী থেকে ভৈরব ব্রিজ পর্যন্ত প্যাকেজ হবে। ইতিমধ্যেই যমুনার ওপরে ডুয়েলগেজ এবং পদ্মার ওপর দিয়ে ব্রডগেজ নির্মাণ করে মূলত আমাদের সমস্ত রেললাইনকেই ব্রডগেজে রুপান্তর করা হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়ে গেলে আর মিটারগেজ বাকী থাকবে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-জামালপুর এবং ঢাকা-সিলেট রেলপথ। অর্থায়ন করা গেলে ২০৩৫ থেকে ৪০ সালের মধ্যে ওইসব রেললাইনও ব্রডগেজে রূপান্তর করার টার্গেট মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।

টঙ্গী থেকে দোহাজারী পর্যন্ত মোট ১২টি রেল সেতু তৈরি করতে হবে। টঙ্গী খাল, বালু, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, পুরনো ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, ছোট ফেনী, মুহুরী, ফেনী, কর্ণফুলী, মাতামুহুরী ও পুরাতন মাতামুহুরী নদীর উপর এসব রেলওয়ে সেতু নির্মিত হবে।

ঢাকা থেকে টঙ্গী, ভৈরব বাজার হয়ে চট্টগ্রাম ধরে কক্সবাজার যেতে ৪৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। অথচ ঢাকার কমলাপুর থেকে সরাসরি দক্ষিণমুখী কুমিল্লার কর্ডলাইন ধরে রেলপথ নির্মাণ করা গেলে ৯৪ কিলোমিটার পথ কমিয়ে আনার পাশাপাশি প্রায় দুই ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হয়। ইকোনমিক্যালি প্রফিটেবল এবং রিলায়েবল করা, দ্রুত যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের অনেক ধরনের উপযোগিতা তৈরি হয়। সেটা দেখে আশির দশকে কুমিল্লার এই কর্ডলাইনটার প্রস্তাবনা।

ঢাকায় রেলনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা যানজট নিরসন করতে পারে৷ ৮০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের জন্য অবশ্য একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷ এটি হবে বৃত্তাকার রেলপথ৷

৬৪টি জেলার মধ্যে ২০টিতে রেল যোগাযোগ নেই৷ এখনো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু জেলা রেল যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন৷ তাই বাংলাদেশ রেলওয়েকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক কাজ বাকি৷ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত রেল-সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ ঢাকা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্তও রেলপথ হবে৷ স্বাধীনতার পর অবহেলিত বাংলাদেশ রেলপথে অবকাঠামো উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য কাজ শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে৷ এখন বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী পরিবহণের সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে৷ নিরাপদ যাতায়াতের জন্য যাত্রীরা রেলের দিকেই ঝুঁকছে৷ রেলপথ ও রেলসেতু নির্মাণ ছাড়াও যাত্রীসেবা বাড়িয়ে রেলকে বদলে দিতে হবে, কারণ, রেল বদলে গেলে দেশের অর্থনীতি আরো ইতিবাচকভাবে বদলে যাবে৷
জাপান ও ভারতসহ বিশ্বের ৫৫টি দেশের দেড়শ’ নগরীর যোগাযোগব্যবস্থা রেলনির্ভর৷ এছাড়া ভারত, নেপাল, মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ, এমনকি ইরান পর্যন্ত সংযোগ তৈরিরও সুযোগ রয়েছে৷ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে ভারত সেবা কিনে নিতে পারে৷ তা সামনে রেখে আখাউড়া-আগরতলার মধ্যে ১৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

Share This Post