‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’স্লোগানে ঘোষিত বাজেটে কেমন হতে পারে শেয়ারবাজার

‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’স্লোগানে ঘোষিত বাজেটে কেমন হতে পারে শেয়ারবাজার

মোর্তুজা মিশু:

বাজেট এর প্রচলন কোথায় কিভাবে?
বাজেট একটি ইংরেজি শব্দ। বাজেট শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ বোওগেট থেকে। যার অর্থ চামড়ার ব্যাগ। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় ১৭২০ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে প্রথম জাতীয় বাজেট ও রাজস্বনীতি উত্থাপন করেন স্যার রবার্ট ওয়ালপোল। এর ঠিক ১৩ বছর পর ওয়ালপোল সরকারের করের বোঝা কমাতে তার রাজস্ব পরিকল্পনায় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের (ওয়াইন, তামাক) ওপর আবগারি শুল্ক ধার্য করার প্রস্তাব করেন। এতে সাধারণ জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে যে উইগ পিয়ার উইলিয়াম ‘দ্য বাজেট ওপেন অর অ্যান আনসার টু এ প্যামফলেট’ নামে একটি পুস্তিকা লিখে ফেলেন। সেবারই প্রথম সরকারের রাজস্বনীতিতে বাজেট শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু, বাজেটের আনুষ্ঠানিক রূপ পায় ১৭৬০ সালে।
পাকিস্তান আমলে বাজেট এর অাকার কেমন ছিল?
১৯৪৮-৪৯ সালের প্রথম বাজেট পেশ করেন হামিদুল হক চৌধুরী। ওই অর্থবছরে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বাজেট ঘাটতি ছিলো। ব্যয় বিবেচনায় ওই বাজেটের আকার ছিলো সাড়ে ৪১ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিলো ১১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ঋণ খাতে আদায় ২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তবে রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি সাড়ে ৮ লাখ টাকা। আর পরিশোধে ব্যয় ১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা।
স্বাধীন বাংলাদেশে বাজেট এর ইতিকথা
এবার অাসি স্বাধীন বাংলাদেশে। স্বাধীন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন।
আর এবছর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল দেশের ৫০ তম বাজেট উপস্থাপন করবেন।
তাজউদ্দীন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন; সেই বাজেটের আকার ছিলো ৭৮৬ কোটি টাকা। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নতুন অর্থবছরের বাজেট ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশের বাজেট উপস্থাপনে একটি স্থানে এখনও অনন্য তাজউদ্দীন আহমদ। কারণ তিনি ছিলেন দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিবিদ যিনি সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী মোট ১২জন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন আর ১৩তম ব্যক্তি হিসেবে লোটাস কামাল বাজেট পেশ করেন।
২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেট কেমন?
এবারের বাজেটের স্লোগান ‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’। এটি হবে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের তৃতীয় বাজেট ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীর তৃতীয় বাজেট। এবারের বাজেটে সরকারের মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে যা ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।বাজেটে ঘাড়তি ২,১৪,৬৮১ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ২,২৫,৩২৪ কোটি টাকার ও বেশি । এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে স্বাস্থ্য খাত। কোভিড-১৯ মোকাবেলা, টিকা, স্বাস্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে এই অগ্রাধিকার। এবারের বাজেটে ৪ টি মৌলিক ভাগে ভাগ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক অবকাঠামো খাতে ১,৭০,৫১০ কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ২৮.২ শতাংশ, সামাজিক অবকাঠামো খাতে ১,৭৯,৬৮১ কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ২৯.৭ শতাংশ, সাধারন সেবা খাতে ১,৪৫,১৫০ কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ২৪ শতাংশ এবং সুদ ও ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ ১,০৮,৩৪০ কোটি টাকা। অাগামী অর্থ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.২ শতাংশ ও মূল্যস্ফতী নির্ধারন করা হয়েছে ৫.৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে বিশাল ঘাড়তী বাজেটে হয়তো সরকারের অর্থের উৎস হতে পারে ব্যাংক ঋন। তবে এটি কোন অাশার বানী নয়। কারন ঋনে জর্জরিত সরকারের বাজেটে ৮-১০ শতাংশ খরচ হয় সুধ পরিশোধে। ৪৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কে কাজে লাগিয়ে বাজেট হতে পারতো চমকপ্রদ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের এতো বেশি রিজার্ভ চাকচিক্য চাড়া কিছুই নয় তবে অর্থনৈতিক দৃড়তা প্রকাশ করে।
বাজেটে শেয়ার বাজারের জন্য প্রনোদনার সুফল কেমন হতে পারে?
এবারের জাতীয় বাজেট দেশের প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। তবে কিছু বিষয় খুব ইতিবাচক। তার মধ্যে শেয়ার বাজারেরে জন্য ঘোষিত প্রনোদনা গুলো অন্যতম যার প্রভাবে হয়তো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে সুফল পেতে পারে সাধারন বিনিয়োগকারীরা। এজন্য যে কয়েকটি প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো আমার দৃষ্টিতে ইতিবাচক।
এবারের বাজেটেশেয়ার মার্কেটের ব্যাংক, বীমা, ফাইনান্স, তামাক, টেক্সটাইল এবং টেলিকম ছাড়া বাকি সব সেক্টরের লিস্টেড কোম্পানির কর হার ২৫% থেকে ২.৫% কমিয়ে ২২.৫% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এচাড়া আইটি ও দেশে উৎপাদিত শিল্পকে এগিয়ে নিতে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতির প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। হোম ও কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেস পণ্য উৎপাদন, কৃষিপণ্যের শিল্পায়ন, কৃষি, ফিশারিজ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, শিল্পের আয়কে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে উৎপাদনকারী ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ অটোমোবাইল-থ্রি হুইলার ও ফোর হুইলার কোম্পানিকে ২০ বছর কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
মেগা শিল্পে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে স্থাপিত অটোমোবাইল (থ্রি হুইলার ও ফোর হুইলার) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০ বছর কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। হোম অ্যাপলায়েন্সেস উৎপাদনে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’কে প্রণোদনা হিসেবে ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার, মাইক্রোওয়েভ অভেন, ইলেকট্রিক সেলাই মেশিন, ইন্ডাকশন কুকার, কিচেনহুড ও কিচেন নাইভস এ সব হোম কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেস উৎপাদনে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
এদিকে ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে হালকা প্রকৌশল শিল্পের সব ধরনের যন্ত্রাংশ ও পণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের। আইটি খাতে বাংলাদেশে আমদানি-নির্ভরতা কাটিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানে প্রণোদনা হিসেবে মাদারবোর্ড, ক্যাসিং, ইউপিএস, স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম, পাওয়ার সাপ্লাই, ইউএসবি ক্যাবল, সিসিটিভি এবং পেনড্রাইভ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকেও ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭৭৮৪ কোটি টাকা। ২০৩০ সাল নাগাদ ৪০০০০ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ মাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার যা শেয়ার বাজারে লিস্টেড বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য ইতিবাচক। এচড়া শরীয়া ভিত্তিক বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সুকুক বন্ডে কর অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে এই বাজেটে। সিমেন্ট ও লোহ কাঁচামাল অামদানীতে উৎসে কর কর্তন ৩% থেকে কমিয়ে ২% করা হয়েছে যা অন্যান শিল্পের ক্ষেত্রে ৪% থেকে কমিয়ে ৩% করা হয়েছে। গবাদী পশু ও পোল্ট্রি ফিড ও কীটনাশক তৈরিকরণ প্রতিষ্ঠানের জন্য কর রেয়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এচাড়া পোশাক শিল্পে বিদ্যমান রপ্তানি প্রনোদনার পাশাপাশি ১% অতিরিক্ত প্রনোদনা রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এসব কিছুর পাশাপাশি বর্তমান বিএসইসির নেওয়া প্রদক্ষেপ গুলোর কারনে অাগামীতে শেয়ার বাজার অতীতের সকল রেকর্ড চাড়িয়ে যাবে বলেই অাশা রাখি। অাইপিও ব্যবস্থার সংস্করণ, ওটিসি মার্কেট বন্ধ করা, কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, লভ্যাংশ প্রদানে জবাব দিহিতা, ২/৩০% নিশ্চিত করদ, বাই-ব্যাক অাইন করা, ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা বৃদ্ধি করা সহ নতুন নতুন ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে অাসা সহ সকল কিছুই বাজারকে ভালো করে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নিয়ামক নিসেবেই কাজ করবে বলে অাশা রাখি।
সব মিলিয়ে বলতেই পারি এবারের বাজেট ব্যবসাবান্ধব তথা শেয়ার বাজারের জন্য ইতিবাচক। তবে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা থাকলে বিনিয়োগকারীদের এবার অানন্দের সীমা থাকতো না যদিও এখনো সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া ব্যাংক, ফাইন্যান্স ও টেক্সটাইল ও মোবাইল অপারেটর সেক্টর নিয়ে বিশেষ প্রনেদনা থাকলে এবারের বাজেট হতে পারতো ইতিহাসখ্যাত। তারপরও বলা যায় এবারের বাজেট বিনিয়োগ বান্ধব কারন এর অাগের কোন বাজেট এতোটা শেয়ারবাজার ও ব্যবসায়ীক বান্ধব ছিলো না।

[মোর্তুজা মিশু, ব্যাংকার( ইউসিবিএল)]

Share This Post