“চীন বন্ধু নাকি অংশীদার”

“চীন বন্ধু নাকি অংশীদার”

মো. মোর্তুজা:

১৯৪৯ সালের পর থেকে চীন নতুন ভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ১৩০ কোটি জনসংখ্যাকে গলার কাঁটা থেকে আশীর্বাদ বানিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ১৫% এখন চীনের দখলে। চীনের প্রেসিডেন্ট জিংপিং এর একটি স্বাপ্নিক প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে নিজের মুঠোয় নিতে চীনা সরকারের নতুন ফাঁদ হলো ঋনের ফাঁদ। চীনা সরকার অনেক দেশকেই ঋন ও শ্রম দিয়ে বড় বড় ইনফ্রাস্টাকচার করে দিয়েছে কারন তারা জানে এই খেসারত দিয়েই তারা একদিন চীনের গোলাম হয়ে যাবে। চীনের সহযোগীতায় দেশীয় অবকাঠামো তরান্বিত হলেও অর্থনীতি রুপ নিবে বটলনেক এ।
১৯৭১ সালে চীনা সরকার পাকিস্তান এর পক্ষে থাকলেও স্বরুপে ফেরা বাংলাদেশ নিয়ে তাদের এখন আড়ম্বর পরিকল্পনা। চীনের কমিনিস্ট পার্টি ছিলো বিএনপির সবচেয়ে কাছের বন্ধু। অথচ সরকার পরীবর্ত হওয়ার পরই তারা আওয়ামী বন্ধু বনে যায়। সর্বোপরি বলতে দ্বিধা নেই যে, চীন কখনোই বন্ধু হতে পারে, শুধু ব্যবসায়ীক অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশের সরকারের অনেক বড় বড় মেগা প্রজেক্টের উন্নয়ন অংশীদার চীন। তবে হয়তো সরকার দক্ষতার সাথেই চীনের এই ফাঁদকে মোকাবেলা করবে। ভৌগোলিক ভাবে দক্ষিন এশিয়ায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও পাশ্ববর্তী ভারত সবসময়ই বাংলাদেশকে নিয়ে পরিকল্পনার চক এঁকে থাকেন। তাই চীনা ঋন নেওয়া ও পরিশোধে এই দেশকে হতে হবে কৌশলী।
এসব ঋনের পিছনে সবচেয়ে বেশী দায়ী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের। বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন নতুন পথ নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালে এ প্রকল্প শুরু হয়। এই প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করতে গিয়েই মূলত ঋন সহায়তা দিয়ে নামান্তরে উক্ত দেশগুলোকে সেই বিআরআই প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছে।। চীনের দেওয়া ঋণে অর্থায়িত উদ্যোগগুলোর একটা বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে চীন ও তার প্রতিবেশী লাওসের মধ্যে রেলপথ নির্মাণের প্রকল্পটিকে। লাওসকে এ জন্য ৪৮ কোটি ডলারের একটি ঋণ নিতে হয়েছিল একটি চীনা ব্যাংক থেকে যা ছিলো লাওস এর বাৎসরিক জিডিপির ২০% এর সমান। লাওসের অর্থনীতিতে সামান্য যে কয়েকটি খাত লাভজনক – তার একটি হচ্ছে তাদের পটাশের খনি। এই খনির আয়কে কাজে লাগিয়ে দেশটি সেই বিশাল ঋণ নিয়েছিল। লাওসের দেউলিয়া হবার উপক্রম হলো ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন দেশটি চীনা দাতাদের ঋণের ভার হালকা করতে তাদের একটি বড় সম্পদ জ্বালানি গ্রিডের একাংশ ৬০ কোটি ডলারে চীনের কাছেই বিক্রি করে দিল।
চীন যে সব রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ঋণ দেয় – তার বিপরীতে অনেক সময় অস্বাভাবিক ধরনের কোল্যাটেরাল দাবি করা হয়। ইদানিং প্রায়ই চীনা ঋণ গ্রহীতাকে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি করে পাওয়া নগদ অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সাথে একটি চুক্তি হয়েছে যাতে বলা হয়, ঋণগ্রহীতা তেল বিক্রি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাবে তা সরাসরি চীন-নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে চীনা ঋণদাতা সাথে সাথেই অ্যাকাউন্টে থাকা সেই অর্থ তুলে নিতে পারবে। শ্রীলঙ্কান সরকারও দুর্নীতির পাশাপাশি এই প্রাকৃতিক সম্পদ দিতে সম্মত হয়েই হাম্বানটোটা বন্দর উন্নয়ন, কলোম্বো কম্পোজিয়াম সিটি উন্নয়নে চীনকে অংশীদার করেছিল। আর সেটাই হলো শ্রীলঙ্কার গলার কাঁটা। ঋন পরিশোধে ব্যার্থ হয়ে ৯৯ বছরের জন্য হাম্বানটোট বন্দর চীনের কাছে ইজারা দিয়ে দিলো যেটা ছিলো শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হওয়ার অন্যতম কারন।
পাকিস্তানের চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপেক বা সিপিইসি) ও গোয়াদার গভীর সমুদ্রবন্দর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর , মালদ্বীপের আন্তদ্বীপ যোগাযোগ সেতু, মিয়ানমারের কিয়াকফ্যু গভীর সমুদ্রবন্দর ও তেল-গ্যাস পাইপলাইন—এগুলো চীনা ঋণের ফাঁদের উদাহরণ হিসেবে ইদানীং প্রোপাগান্ডা-যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের ব্যবহারও তেমন বাড়ানো যাচ্ছে না এবং সিপেকের সুবিধা নিয়ে চীন থেকে গোয়াদার বন্দর পর্যন্ত নির্মিত দীর্ঘ মহাসড়কের আশপাশে শিল্পায়নের মহাযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে বলে যে আশাবাদ পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছিল, তারও কোনো হদিস মিলছে না।
চীনের কাছে জিবুতি, লাওস, জাম্বিয়া এবং কিরগিজস্তানের ঋণের পরিমাণ তাদের বার্ষিক মোট জাতীয় উৎপাদনের ২০ শতাংশের সমান। চীনের কাছ থেকে নেওয়া এসব ঋণের বেশিরভাগই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য, যার মধ্যে রয়েছে সড়ক, রেলওয়ে এবং বন্দর নির্মাণ। খনি উত্তোলন থেকে শুরু করে জ্বালানি শিল্পের জন্যেও এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ঋণই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের আওতায়।
সম্প্রতি চীন বাংলাদেশকে তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনায় ও সিল্কসিটি নির্মানে বড় রকমের টোপ গেলানোর চেষ্টায় আছে। এই মূহুর্তে দেশকে বৈদেশিক মন্দা মোকাবেলায় ই হবে বাংলাদেশে মতো উন্নয়নশীল দেশের পরিপক্বতার পরিচয়। তারপরও ওয়ার্ল্ড ইকোনোমি জায়ন্ট চীনকে এভয়েড করে চলার সুযোগ নেই। তবে কৌশলী হতে হবে চীনের সাথে। সর্বোপরি চীন কোন দেশের বন্ধু হতে পারে না। তারা হতে পারে কেবল মাত্র ব্যবসায়ীক ও উন্নয়ন অংশীদার।

মো. মোর্তুজা: ব্যাংকার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি

Share This Post