চাঁদাবাজি ও টেলিযোগাযোগ আইনের মামলায় আটদিনের রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীর

চাঁদাবাজি ও টেলিযোগাযোগ আইনের মামলায় আটদিনের রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীর

প্রতারণাসহ দুই মামলায় আবারো ৮ দিনের রিমান্ডে আওয়ামী লীগ থেকে বাদ পড়া ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর। মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) তিনদিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হলে দ্বিতীয় দফায় তার রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

আজ মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনুর রহমান রাজধানীর পল্লবী থানার পৃথক দুই মামলায় বিতর্কিত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন । পল্লবী থানার চাঁদাবাজি ও টেলিযোগাযোগ আইনের মামলায় চারদিন করে আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনুর রহমান।
আওয়ামী লীগের উপকমিটির পদ থেকে বহিস্কৃত হেলেনা জাহাঙ্গীর তার জয়যাত্রা টেলিভিশনটি হংকংয়ের একটি ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে সম্প্রচার করছিল। যা সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। প্রতিমাসে হংকংয়ের স্যাটেলাইটটি ব্যবহারের জন্য ছয়লাখ টাকা পরিশোধ করত।হেলেনার দুই সহযোগী হাজেরা খাতুন ও সানাউল্লাহ নুরীকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য পেয়েছে এলিট ফোর্স র‌্যাব।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র জানান, র‌্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৪ এর অভিযানে আজ ভোরে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অন্যতম সহযোগী হাজেরা খাতুন এবং সানাউল্লাহ নুরীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানে দুটি ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত বেশ কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে। হেলেনার নিকট আত্মীয় হওয়ায় কর্মদক্ষতার কারণে অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন হাজেরা। ২০১৬ সালে হাজেরা জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের ডিজিএম হিসেবে নিয়োগ পান। ‘জয়যাত্রা টিভি’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জিএম (অ্যাডমিন) পদেও তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। গ্রেপ্তার হাজেরা হেলেনা জাহাঙ্গীরের আর্থিক বিষয়াগুলো দেখভাল করতেন। ২০১৮ সাল থেকে জয়যাত্রা টিভি হংকংয়ের একটি ডাউন লিংক চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচারিত হয়ে আসছে। যার ফ্রিকুয়েন্সি হংকং থেকে বরাদ্দ করা হয়। এই ফ্রিকুয়েন্সির জন্য প্রতি মাসে প্রায় ছয় লাখ টাকা পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু হংকং থেকে বরাদ্দ ফ্রিকুয়েন্সি থেকে দেশে সম্প্রচারের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছেন হাজেরা। এছাড়া সম্প্রচারের জন্য ক্যাবল ব্যবসায়ীদের কাছে ‘রিসিভার’, জয়যাত্রা টিভি বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরবরাহ করত। কিন্তু ক্যাবল ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সম্প্রচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক জেলা প্রতিনিধি চাকুরিচ্যুত হয়েছেন।

র‌্যাব জানায়, জয়যাত্রা টেলিভিশন দেশের প্রায় ৫০টি জেলায় সম্প্রচারিত হতো। টিভি চ্যানেলটি রাজধানী ও জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনপ্রিয় করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছিলেন হেলেনা। যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অধিকসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা যায়। আবার কখনও গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা প্রতিনিধি নিয়োগে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। এছাড়া উপজেলা প্রতিনিধি হতে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। এসব টাকা এককালীন দিতে হতো।

এর আগে গত ৩০ জুলাই গুলশান থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় হেলেনা জাহাঙ্গীরের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। সেই রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রথমে সখ্যতা তৈরি করতেন আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর, এরপর ব্ল্যাকমেইল করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন তিনি।
হেলেনা সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির জন্য থেমে থাকেননি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তার। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যাকেই প্রয়োজন হয়েছে তাকে তিনি ঘায়েল করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন এবং সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছেন শুধু উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। আমাদের মামলার কারণ এটাই। সে রাষ্ট্রের ব্যক্তিদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে যা তাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে, জনগণের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন মাধ্যম এবং টেলিভিশনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে, এজেন্সি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা আদায় করতেন। কারও কাছ থেকে ১০ হাজার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, আবার কারও কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছেন বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। জয়যাত্রা টেলিভিশনের আইডি কার্ড ব্যবহার করে অনেক প্রতিনিধিও এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কী কারণে টাকা নিয়েছেন এবং কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে- এ বিষয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

অস্ট্রিয়া প্রবাসী আলোচিত-সমালোচিত সেফুদার সঙ্গেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের লেনদেন ছিল বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সেফুদা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে দেশবাসীর নজর কাড়তে চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে গ্রেফতারকৃতের নিয়মিত যোগাযোগ ও লেনদেন রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। তিনি আরও জানান, হেলেনা সেফুদাকে নাতি ডাকতেন। সেফুদার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং তার সঙ্গে লেনদেনও ছিল হেলেনা জাহাঙ্গীরের।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) রাতে হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশানের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। তার বাসা থেকে ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ মাদক, একটি হরিণের চামড়া, একটি বন্য পশুর চামড়া, ১০ ধরনের বিদেশি চাকু, বিপুল সংখ্যক বিদেশি মুদ্রা, দুটি ওয়াকিটকি ও একটি লাল রঙের লাগেজ ভর্তি অবৈধ জিনিস উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে গভীর রাতে তার জয়যাত্রা আইপি টিভি ও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনেও অভিযান চালানো হয়। বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার দেখালো র‌্যাব

এর আগে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ২৫ জুলাই দলটির মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সচিব মেহের আফরোজ চুমকি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর অপকৌশলের মাধ্যমে ‘মাদার তেরেসা’, ‘পল্লী মাতা’ ও ‘প্রবাসী মাতা’ হিসেবেও হেলেনা জাহাঙ্গীর পরিচিতি পেতে চেয়েছিলেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব। গ্রেফতার হেলেনা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রেখে নিজের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন। তার প্রায় ১২টি ক্লাবের সদস্যপদ রয়েছে। হেলেনা জাহাঙ্গীরের স্বামী ১৯৯০ সাল থেকে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে অন্যদের সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি।

Share This Post