করোনায় টিউশনি বন্ধ, মানবেতর জীবন যাপন করছে অজস্র তরুণ তরুণী

করোনায় টিউশনি বন্ধ, মানবেতর জীবন যাপন করছে অজস্র তরুণ তরুণী

রায়হান হাবিব দুলাল :

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জহিরুল ইসলাম ঢাকার একটি বাসায় টিউশনি করতেন। এখান থেকেই তার হাতখরচ, পড়াশোনার খরচ, চাকরির আবেদনের ফি সব উঠে আসত। কিন্তু গত বছর ২০২০ সালের মার্চ মাসে কভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরু হওয়ায় সেই টিউশনি এ পর্যন্ত বন্ধ আছে।

এ বিষয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন,”পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা আসলাম টিউশনির পাশা পাশি চাকরির প্রস্তুতি নিবো বলে। দুটো টিউশন করতাম। যে পরিমান টাকা আসত তা দিয়েই মোটামুটি সব হয়ে যেত। কিন্তু গত বছর করোনার সময় টিউশন বন্ধ হয়ে যায়। এর পরে শুরু হয় মানবেতর জীবন যাপন। এখন টুকটাক কাজ করে কোন রকমে বেঁচে আছি।”

তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আকাশ রহমান জানান, টিউশনিতে একটু সুবিধা পেলেও আগের মত অবস্থা নেই। তিনি বলেন,
”আমি চারটা টিউশনি করতাম। কিন্তু করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকেই সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।”
তবে কড়াকড়ি অবস্থা শেষ হলে মাত্র দুটো টিউশন করতে পারছেন তিনি। মাঝে মাঝে অনলাইন ব্যবহার করে ক্লাস করাতে হয়। আর যে সব বিষয়ে অনলাইনে পুরোটা সম্ভব না,স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাসায় গিয়ে সেগুলো সমাধান করতে হয়। তবে টিউশনি দুইটা কমে যাওয়াতে পরিবারকে নিয়ে চাপের মধ্যে আছেন তিনি।

তার আশঙ্কা করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হয়তো তিনি আর আগের মতো করে টিউশনি করাতে পারবেন না।

ঢাকা ও তার আশেপাশের বড় শহরগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের প্রধান উৎস টিউশনি। এর মাধ্যমে থাকা-খাওয়ার খরচের পাশাপাশি পড়াশোনার খরচও উঠে আসে।

কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ পর্যন্ত এই আয়ের উৎস প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে অসংখ্যা ছাত্রছাত্রী ও টিউশনির উপর নির্ভরশীল যারা তারা বেকায়দায় রয়েছেন।

২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখের মত। এর মধ্যে কাজ করেন প্রায় ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ আর বাকী ২৭ লাখেরও বেশি জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে বেকার।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এই বেকারদেরও বড় একটি অংশ আয়ের জন্য টিউশনির ওপর নির্ভরশীল। এদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা এই টিউশনির টাকায় পারিবারিক সমস্ত ব্যয় নির্বাহ করে থাকেন।

তবে কতো মানুষ টিউশনি করেন বা কতজন এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য উপাত্ত নেই।

তবে অনেকে যেমন পড়াশোনার পাশাপাশি খরচ চালাতে টিউশনি করেন, অনেকে আবার একে পুরোপুরি পেশা হিসাবেও নিয়েছেন। অনেক এলাকায় বিভিন্ন ‘স্যার’ নামে এরকম পেশাদার শিক্ষকদের বিজ্ঞাপন দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর টিউশনি করাকেই আয়ের উৎস হিসাবে নিয়েছেন নাসরিন আক্তার।

”অনেকদিন সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছি। এখন আর শক্তি ও ধৈর্য্য কাজ করেনা। তাছাড়া বয়সও প্রায় শেষ। অনার্স পড়াকালীন সময় থেকেই টিউশনি করতাম। এখন পুরোপুরি সেটা করতে শুরু করেছিলাম। যা আয় হতো, তাতে আমার সব খরচ চলে যেতো। পরিবারকেও ভালো সাপোর্ট দিতে পেরেছিলাম। কিন্তু কভিড-১৯ সমস্ত কিছু শেষ করে দিল।”

গত দেড় বছর যাবৎ তার কোন টিউশনি নেই, কবে আবার শুরু করতে পারবেন জানেন না।

শুধু যারা টিউশনি করতেন, তারাই যে এই বিপদে পড়েছেন তাই নয়, সংকটে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরাও।

কারণ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় টানা দেড় বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার কারণে সন্তানদের পড়াশোনা চরম মাত্রায় ব্যাহত হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই অনলাইনে কার্যক্রম শুরু করেছে।

কিন্তু স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গৃহশিক্ষককে আসতে বলতে পারছেন না অভিভাবকরা। ফলে সন্তানদের পড়াশোনাও ঠিকমতো হচ্ছে না বলে অভিভাবকরা চিন্তায় পড়েছেন। মার্চ মাস থেকেই কোচিং সেন্টারগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।

ঢাকার নিকটস্থ নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দা রুম্পা আফিয়া বলছেন, ”আমার ছেলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। টিচার না থাকলে বাসায় কোন পড়াশোনা হয় না সেটা জানি। কিন্তু এখন যে অবস্থা, বাসায় তো কাউকে আসতেও বলতে পারি না। ছেলের অনলাইনে ক্লাস হয়, শুনলাম অনেকেই নাকি অনলাইনেও টিউশনি করায়। তবে এ বিষয়ে ভাবছি দেখি কি করা যায়।”

যেসব প্রতিষ্ঠান অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে টিউশনির জন্য সমন্বয়কারী হিসাবে কাজ করে, তারা বলছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে টিউশনির বাজার শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।

বিডি হোম টিউটর নামের টিউশনি খোঁজার একটি অ্যাপের অন্যতম উদ্যোক্তা মিজবুর রহমান পাটোয়ারি বলছেন, ” করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার আগে প্রতিমাসে আমরা কমপক্ষে ২৫/৩০ কিংবা তার বেশি টিউশনির অনুরোধ পেতাম। কিন্তু গত বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন আর কোন টিউশনির অনুরোধ আসছে না।”

করোনাভাইরাস সংক্রমণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই পরিস্থিতির খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হবেনা বলে তিনি মনে করেন।

Share This Post