এসএমই খাত নিয়ে কিছু কথা

এসএমই খাত নিয়ে কিছু কথা

জসিম উদ্দিন:
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত (এসএমই) শ্রমঘন শিল্পখাত। স্বল্প বিনিয়োগ, কম খরচে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানব সম্পদের দ্রুত উন্নয়নের সুযোগ এবং কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন থাকায় দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়া রপ্তানি শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং বৃহৎ শিল্পের ফরওয়ার্ড লিংকেজ হিসাবেও এসএমই খাত সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানী আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত।
দেশের শিল্প কল-কারখানায় নিয়োজিত মোট শ্রমিকের প্রায় ৮০ ভাগ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্গত। জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ যা ২০২৪ সাল নাগাদ ৩২ শতাংশ করার পরিকল্পনা সরকারের আছে।
অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচিত এ খাত; করোনা মহামারির প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে। তবে এর ৭৩ শতাংশ এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে মাইক্রো এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের সাথে পূর্ব পরিচিতি না থাকায় এসব ব্যবসায়ীরা সরকারের দেয়া প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার ঝুঁকি বিবেচনা করেও ব্যাংকগুলো এই খাতে ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখায়, যদিও পরিসংখ্যান বলছে; এসএমই খাতে অন্যান্য খাতের তুলনায় খেলাপির পরিমান কম। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই খাত টিকিয়ে রাখতে বিশেষ ভুমিকা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ৫০০ টাকার স্টার্টআপ ফান্ড নামে পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের পাশাপাশি বিশেষ সার্কুলারের মাধ্যমে ২০২১ সাল থেকে আগামী ৫ বছরের জন্য ব্যাংকগুলোর নীট মুনাফার ১ শতাংশ অর্থ স্থানান্তর পূর্বক নিজস্ব স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া মফস্বলভিত্তিক শিল্প স্থাপনে এবং গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনের জন্য ৭০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। সরকারের এসব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
এছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক কর্তৃক করোনায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য দেয়া ২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা এসএমইদের সহযোগিতায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।
করোনা মহামারির ন্যায় ভবিষ্যত প্রাকৃতিক দূর্যোগকে বিবেচনায় রেখে এসএমই খাতের ইন্স্যুরেন্স কাভারেজকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
চতুর্থশিল্প বিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে এসএমই শিল্পকে এগিয়ে নিতে ডিজিটাল, বায়োলজিক্যাল এবং ফিজিক্যাল উদ্ভাবনীতে আমাদের গবেষণা কার্যক্রমকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসএমই খাতের জন্য জমি বরাদ্দ এবং ইউটিলিটি সুবিধা প্রদানে বিশেষ সুযোগ থাকতে হবে। এছাড়া উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ জনশক্তি তৈরী ও উচ্চমূল্য সংযোজনের জন্য উৎপাদন খরচ কমিয়ে এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে গ্লোবাল ভ্যালুচেইনের অংশিদার হতে এসএমই খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০৪১, ২০৩০ সালে এসডিজির লক্ষমাত্রা অর্জন এবং ডেল্টা -২১০০ মহাপরিকল্পনায় গৃহীত পদক্ষেপসমূহ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করবে। এসব রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত পদক্ষেপের ফলে ২০৪১ সাল নাগাদ আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ১০ শতাংশ। এজন্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান বর্তমান ২৪.১৮% থেকে বেড়ে ২০৪১ সালে প্রায় ৪৫ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে সরকারের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে শিল্প খাতের তথা এসএমই খাতে বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নে এসএমই খাতের সমস্যাসমূহ চিহ্নিতকরণ ও তা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।
এই খাতের সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- পণ্য বৈচিত্রকরণে দক্ষতার অভাব, পর্যাপ্ত গবেষণা ও উন্নয়নের অভাব, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব, উচ্চ কাস্টমস ডিউটি এবং জটিল ও হয়রানিমূলক কাস্টমস পদ্ধতি, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জামানত সমস্যা এবং ঋণ আবেদন পত্রের জটিলতা। এছাড়া রপ্তানী বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এসএমই খাত যথাযথ তথ্যের অভাব, যোগানের সীমাবদ্ধতা, পণ্যের গুণগত মান ও আকর্ষনীয় মোড়ক, মূলধনের অভাব, নন ট্যারিফ বাঁধা এবং তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব ইত্যাদি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
এসব সমস্যা সমাধানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে এফবিসিসিআই, এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিক এবং রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর সাথে সমন্বিত ভাবে কাজ করলে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরো ত্বরান্বিত হবে বলে আমরা মনে করি।

(জসিম উদ্দিন: এফবিসিসিআই এর সভাপতি ও বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ।)

Share This Post